অধিক মাস নিজেকে অসংরক্ষিত অনুভব করল, কারণ লোকেরা তাকে খারাপ নামে অর্থাৎ মলমাস বলে ডাকে। তাই নারায়ণের কাছে গেল এবং তাঁকে জিজ্ঞাস করল এখন সে কী করবে। তখন তিনি তাকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করাতে নিয়ে গেলেন এবং অধিক মাস তখন নিজেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে সমর্পন করলেন এবং ভগবান শ্রীকৃৃষ্ণ বলেন, যে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, আমি তার প্রতি বিশেষ কৃপা প্রদান করি। তাই আমি তোমার নামের সঙ্গে আমার নাম যুক্ত করার অনুমতি দিলাম। এখন থেকে তুমি পুরুষোত্তম মাস নামে পরিচিত হবে এবং আমার মধ্যে যে মহিমা আছে তোমার মধ্যেও সেই মহিমা থাকবে। লোকজন তোমাকে পূজা করলেই আমাকে পূজা করার মতো একই ফল প্রাপ্ত হবে। বছরের সকল মাসের মধ্যে কার্তিক মাস বা দামোদর মাস অন্যান্য সাধারণ মাসগুলোর চেয়ে একশত গুণ বেশি ফল লাভ করে। কিন্তু পুরুষোত্তম মাস যা তিন বছর অন্তর একবার আসে, তার গুরুত্ব দামোদর মাসের চেয়ে এক হাজার গুণ বেশি ক্ষমতাশালী। তাই মানুষের কাছে হরিনাম করার, ভগবৎ সেবার অথবা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রদীপ দেখানোর এটি একটি মহান সুযোগ। এই প্রকারে তারা তাদের পারমার্থিক সেবা বৃদ্ধি করতে পারে অথবা শুরু করতে পারে। আমি শ্রীল প্রভুপাদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, কার্তিক মাসে আমাদের কী করা উচিত। তিনি বললেন, কেবল সাধারণ লোকেরা পুরুষোত্তম মাস দ্রুত পালন করতে আসে, এটি তেমন, যখন কোনো দোকানে বছরের শেষে জমে থাকা অবিক্রীত জিনিসপত্র বিক্রী করার জন্য প্রচুর পরিমাণে ছাড় দেয়, তখন মানুষ সস্তায় ঐ সকল জিনিস কেনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তোমরা ভক্তরা হচ্ছে নিয়মিত খরিদ্দার যারা দোকানে কোন ছাড় পাবে কিনা, তার ওপর ভ্রুক্ষেপ নেই।
কোনো কোম্পানি যখন তাদের মজুদ পণ্যের ওপর ৭০ শতাংশ বিক্রয় ছাড় দেয়, লোকজন তখন সস্তায় যা কিছু পায় তা কেনার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কিছু জায়গা আছে যেখানে বড়দিন এর (খ্রিষ্টমাস) পরে বিক্রয় দিন চালু হয় এবং লোকজন রাস্তার উপরে তাঁবু টানিয়ে দোকান দেয় এবং দোকানদারেরা যখন দরজা খোলে, তখন লোকজন তাড়াতাড়ি করে দোকানে ঢুকতে চায় “আহ্ দেখি আমি কিসের ওপর ছাড় পেতে পারি ?” আমরা আশা করি, মানুষের মধ্যে যদি কৃষ্ণপ্রেম পাওয়ার জন্যও এমন উৎসাহ থাকত। পুরুষোত্তম মাস পালন করলে, আপনি এ জীবনেই সুখ ও শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারবেন এবং যখন এ জীবন সমাপ্ত হয়ে যাবে, তখন আপনি পারমার্থিক জগতে কৃষ্ণলোকে ফিরে যাবেন। তাই শ্রীল প্রভুপাদ নির্দিষ্ট করে বলেছেন যে, পুরুষোত্তম মাস ব্রত বিশেষ অর্থ হচ্ছে, যে সমস্ত লোক কেবল সেই সময়ে মন্দিরে আসেন, যখন গ্রন্থের ওপর কোনো ছাড় দেওয়া হয়ে থাকে, সেই অনিয়মিত খরিদ্দারদের যারা কেবল তখনি দোকানে কেনাকাটা করার যায়, যখন সেখানে কেনাকাটার ওপর বিশেষ ছাড় পায়। আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম সেখানে আমি একজন মহিলার সাথে কথা বলছিলাম; আমি তাকে বললাম- আপনার জপ করা উচিত। এখন পুরুষোত্তম মাস চলছে এবং আপনি এক গুণ বেশি ফল লাভ করতে পারবেন। তাই আপনি চাইলে সবচেয়ে কম সংখ্যা অর্থাৎ দিনে আপনি এক মালাও জপ করতে পারেন এবং পরের দিন এক মালা বেশি অর্থাৎ দুই মালা এবং তারপর তিন মালা করে জপ করুন। তিনি বললেন- ঠিক আছে আমি জপ করব। কিন্তু তিনি ফিরে এলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন- আমি যদি একদিন জপ না করতে পারি তবে কোনো অভিশাপ বা কুফল পাব কি ? আমি বললাম, না না তাতে কোনো সমস্যা হবে না।
ভক্তরা হলেন নিয়মিত খরিদ্দার। তারা নতুন লোকদের জপ করার জন্য সংগ্রহ করে আনতে পারেন। আমি তেমন কিছু ভক্তদের ছবি দেখে খুব খুশি হয়েছি, যারা প্রতিদিন একটি উদ্যানে যান, সেখানে তারা জন পঞ্চাশ লোক একত্রে তাদের ঘৃত প্রদীপ দেন এবং তাদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আলেখ্যের উদ্দেশ্যে দীপ দান করতে দেন। কিছু ব্রহ্মচারী তাদের প্রতিবেশীদের অনুগ্রহ করে জপ করতে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু তারা বললেন, আমার কোন সময় নেই। অথচ তাদের নিজের কুকুরকে স্নান করানোর জন্য অনেক সময় আছে, কুকুরকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার সময় আছে আরও কত কী। ব্রহ্মচারী তখন বলল, আপনার কুকুরটি সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে জপ করা উচিত। যাহোক, একজন আমেরিকান মহিলা তার বিড়ালের নামে ৪১ কোটি ডলার উইল করেছিলেন। এটি কোনো নাইজেরিয়ার কেলেঙ্কারি নয়। এটি একটি বিশেষ ট্রাষ্ট তহবিলের টাকা। তার মৃত্যুর পর, এই অর্থকড়ি দান করে দেওয়া হবে। সুতরাং, ঐ বিড়ালটি ছিল সবচেয়ে ধনী বিড়াল। যখন বিড়ালটির পক্ষ হয়ে সকল অর্থ রাখলেন, যাতে ঐ বিড়ালটির সঠিকভাবে খাওয়াতে অসুবিধা না হয়, তাকে যেন সুন্দরভাবে ব্রাশ করে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু একটি বিড়ালের পেছন আপনি কত খরচ করতে পারেন ? তাই আমরা সহজেই বলতে পারি যে, ঐ মহিলাটি পরবর্তী জীবনে কী হবে। তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল ঐ বিড়ালটি এবং তার সব অর্থকড়ি বিড়ালটির নামে উইল করে দিয়েছিল। আপনি মৃত্যুর সময় যা চিন্তা করতে করতে মৃত্যুবরণ করবেন, পরবর্তী জীবনে আপনি তাই হয়ে জন্ম গ্রহণ করবেন। আমরা পুরুষোত্তম মাসে জপ করার নির্দেশ দিই, যাতে তাদের আর কুকুর, বিড়াল অথবা অন্য কোন জন্ম নিয়ে ফিরে আসতে না হয়। তার চেয়ে ভালো যে, তারা পারমার্থিক জগতে ফিরে যাক, যেখানে কোনো বৃদ্ধ অবস্থা নেই, কোনো রোগ নেই এবং কোন জন্ম-মৃত্যু নেই। একবার তারা যদি সেখানে যায় তবে, তাদের ফিরে আসতে হবে না।
এই পুরুষোত্তম মাস চলাকালীন স্মার্ত মতে কোনো সংস্কারাদি অথবা বিবাহের কোনো অনুমোদন নেই। স্মার্তরা এই মাসকে পছন্দ করে না, কিন্তু এই মাসটি বিশেষ করে পারমার্থিক কার্যাবলির মাধ্যমে অধিক পরমার্থ আয় করা যায়। দুটি বিষয় জানা দরকারঃ ১) কর্ম এবং ২) সুকৃতি।
১) কর্মঃ কর্মের মধ্যে পাপ এবং পুণ্য থাকে। কেউ হয়তো প্রচুর সম্পত্তি দান করতে পারে এবং প্রচুর পুণ্য অর্জন করতে পারে, কিন্তু যে সমস্ত পাপ ও অপরাধ তারা করেছে, এই প্রকার পুণ্য অর্জন তাদের প্রাপ্য অর্থ বা অপরাধ নষ্ট করতে পারে না। উপরন্তু তারা হয়ত আরো পাপ কর্মে লিপ্ত হয়ে তাদের পাপের অথবা অপরাধের বোঝাকে বাড়িয়ে তোলে। লোকজন প্রথমেই তাদের পুণ্যফল ভোগ করে নেয় এবং যখন তা শেষ হয়ে যায়, তারা তাদের কৃত পাপ অথবা অপরাধের ফলাফলের মুখোমুখি হয়।
২) সুকৃতিঃ সুকৃতি হচ্ছে পারমার্থিক আয় এবং এর কোনো ক্ষয় নেই। এটি কেবল যোগ হতে থাকে, কিন্তু অপরাধের দ্বারা ক্ষতিপ্রাপ্ত হয়। কেউ যদি বৈষ্ণব অথবা দিব্য ধামের প্রতি অপরাধ করে। পবিত্র মাস অথবা শুদ্ধ ভক্তের প্রতি অপরাধ করে, এ ধরনের অপরাধ কারো সুকৃতি বিনষ্ট করে। অন্যদিকে, যদি কেউ অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে, তবে সুকৃতি যুক্ত হতে থাকবে, তিনি চিন্ময় ধঅমে ফিরে যাবেন। এই জড় জগৎটি প্রাথমিক ভাবে একটি জেলখানা। এখানে কেউ তার পুণ্যকর্ম দ্বারা পাঁচ তারা বিশিষ্ট জেলের কুঠরি পেয়েছে, কিন্তু তারপর আবার জন্ম-মৃত্যু গ্রহণ করতে হবে ঠিক ভরত মহারাজের মতো, যার নাম অনুসারে এই গ্রহের নাম হয়েছে। যখন তিনি দেহ ত্যাগ করেছিলেন, ভরত মহারাজ তাঁর পালিত হরিণটির কথা চিন্তা করেছিলেন। এ ধরনের চিন্তার ফলে পরবর্তী জীবনে তাঁকে পুনরায় এ জগতে একটি হরিণ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর স্মরণে ছিল যে, তিনি পূর্ববর্তী জীবনে সমগ্র পৃথিবীর সম্রাট ছিলেন। একবার শুধু চিন্তা করে দেখুন যে, তখন তিনি কেমন অপমান অনুভব করেছিলেন, যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি পূর্ব জীবনে সম্রাট ছিলেন এবং এখন তিনি অধৎপতিত হয়ে হরিণ হয়ে জন্মেছেন।তার পরবর্তী জীবনে তিনি জড় ভরত হয়েছিলেন। এ জন্মে তিনি পূর্ণরূপে আত্মজ্ঞানী ছিলেন এবং এ জন্মে তিনি আর কোনো ভুল করতে চাননি। তিনি কৃষ্ণের কাছে ফিরে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাই তিনি একজন নির্বোধ ব্যক্তির মতো আচরণ করতে লাগলেন, যদিও তিনি ছিলেন এই গ্রহের সর্বোত্তম বিজ্ঞ ব্যক্তি। একবার যখন রাজা রহুগণ পালকিতে করে যাচ্ছিলেন তাঁর একজন পালকিবাহকের পায়ে কাঁটা বিঁধে গেল এবং তখন রাজা সেখানে জড় ভরতকে দেখলেন এবং তাকে ডাকলেন এবং ঐ কাঁটা বিদ্ধ পালকিবাহকের জায়গায় গিয়ে তাকে পালকি বহন করতে আদেশ দিলেন। জড় ভরত তাঁর আদেশ পালন করে পালকি বাহন করতে শুরু করলেন। যখন জড় ভরত এগিয়ে চলতে লাগলেন, তিনি মাটিতে কিছু পিপীলিকা দেখতে পেলেন। যাতে তিনি কোনো পিপীলিকার উপর পার দিয়ে আবার কোনো অপরাধ না করেন, সেজন্য তিনি সেগুলোগে বাঁচানোর জন্য এদিক ওদিক পা দিয়ে চলেতে থাকলেন। এ সময় পালকিটি বেসামালভাবে দুলছিল এবং রাজা অসুবিধা বোধ করছিলেন। রাজা খুব রেগে গেলেন এবং বললেন- এই যে স্থুলকায়, তোমার কি অসুবিধা হচ্ছে ? তুমি কি করছ ? সোজা হয়ে চলো। কিন্তু জড় ভরত কোনো অপরাধ করতে চাইলেন না। তাই তিনি বললেন, আসলে আমি মোটা বা পাতলা নই। বাস্তবে আমি এ দেহ নই। তিনি রাজার সকল প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর উত্তরগুলো ছিল উচ্চ স্তরের। তারপর রাজা তাঁর সকল বাহকদের পালকিটি থামিয়ে নিচে নামাতে বললেন এবং জড় ভরতকে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে ? কি করে আপনি এ জ্ঞানগর্ভ কথা জানলেন ? তখন তাঁরা উভয়েই এক আলোচনা করলেন এবং ঐ রাজা তাঁর শিষ্যে পরিণত হলেন। তারপর জড় চিন্ময় জগতে ফিরে গেলেন। এই কাহিনীটি এতই চমৎকার যে, এমনকি ঊর্ধ্ব জগতের আধিবাসীদের কাছেও তা এতই জনপ্রিয় যে, তারপর থেকে তাঁরা এই গ্রহকে ভারতবর্ষ নামে ডাকতে শুরু করেন। এই ঘটনার পূর্বে গ্রহটি ইলাবৃতবর্ষ নামে জানা যেত। অতএব আমাদেরকে যে কোনো অপরাধ বা পাপকর্ম থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়া উচিত বা আমাদের সুকৃতি বৃদ্ধি করে এবং হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করা উচিত। (শ্রীমৎ জয়জতাকা স্বামী মাহারাজের- প্রবোচন, বসন্তকুঞ্জ, দিল্লী)।
No Comment! Be the first one.