পুরুষোত্তম মাসের এত ক্ষমতা যে, এই মাস পালনকারী সকলকে আমি কৃপা করতে দায়বদ্ধ। যিনি এ ব্রত পালন করেন তার পূর্বের সকল পাপ বিনাশ হয়। পুরুষোত্তম ব্রত পালন না করে কেউ শুদ্ধভক্তিযুক্ত সেবা করতে পারে না। বেদে বর্নিত অন্যান্য কঠোর সংযমও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার চেয়েও পুরুষোত্তম মাসের গুরুত্ব অনেক অধিক। যে ব্যক্তি পুরুষোত্তম ব্রত পালন করেন তিনি এই জীবনান্তে আমার নিত্য ধাম গোলক প্রাপ্ত হবেন।
দুর্বাসা মুনিঃ পুরুষোত্তম মাসে কেবল একটি পবিত্র নদীতে স্নান করেই যে কেউ সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হতে পারেন। অন্য সকল মাসের মহিমা এই পুরুষোত্তম মাসের মহিমার একষোড়াংশও নয়। পুরুষোত্তম মাসে পবিত্র স্থানে স্নানের মাধ্যমে, দানের মাধ্যমে ও কৃষ্ণের পবিত্র নাম জপের মাধ্যমে সকল দুঃখ হতে পরিত্রাণ পাওয়া যায়, যেকোনো ধরনের পরিপূর্ণতা লাভ করা যায় ও যেকোন আকাঙ্ক্ষা পূর্ন করা যায়।
বাল্মীকি মুনিঃ পুরুষোত্তম মাস পালনকারী এক হাজার অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠানের চেয়েও সুফল লাভ করেন। পুরুষোত্তম মাস পালনকারীর দেহে সকল দাম বাস করেন। যিনি শ্রদ্ধাভরে এর ব্রত পালন করেন তিনি গোলক বৃন্দাবনে ফিরে যান।
নারদ মুনিঃ সকল মাস, বৃত ও সংযমের মধ্যে পুরুষোত্তম মাস শ্রেষ্ঠ। কেবল শদ্ধাবনত চিত্তে পুরুষোত্তম ব্রত মাহাত্ম্য শ্রবণ মাত্রই কৃষ্ণ ভক্তি লাভ হয় ও সমস্ত পাপকর্মের ফল বিনাশ হয়। যিনি শুদ্ধভাবে পুরুষোত্তম ব্রত পালন করেন তিনি অশেষ সুকৃতি লাভ করেন ও চিন্ময় জগতে ফিরে যান।
নৈমিষারণ্যের ঋষিগণ বলেনঃ করুণাময় পুরুষোত্তম মাস কল্পবৃক্ষের ন্যায় ভক্তের কামনা পূর্ণ করেন।
এ বৎসর আধি-মাস বা পুরুষোত্তম মাস সমুপস্থিত হইয়া জীবের অধিক কৃষ্ণসেবানুকূল্যময় করেছেন। পুরুষোত্তম-মাস ভগবান পুরুষোত্তমের ন্যায় সর্ব্বগুণাধার এবং অন্যান্য সমস্ত মাসের মুকুটমণি স্বরুপ। বৈশাখাদি পুন্য-মাসসমূহ পুরুষোত্তম মাসের সহিত কোনো প্রকারেই তুলনীয় নহেন। শ্রীভগবান স্বয়ং এই অধিমাসকে অঙ্গীকার পূর্ব্বক নিজের সমস্ত ভগবত্বা প্রদান করিয়াছেন, এসমস্ত কথা বৃহন্নারদীয় পুরাণাদি পাঠে আমরা জানিতে পারি। এই মাসে কর্ম জড় স্মার্ত সম্প্রদায় কর্মকাণ্ডীয় বিচারে সর্ব প্রকার শুভ ও পুণ্যকর্ম হইতে বিরত থাকেন এবং এই অধিমাসকে মলমাস বা মলিনমাস সংজ্ঞায় অভিহিত করেন। কর্ম, সুষ্ঠুরূপে অনুষ্ঠিত হইলে জ্ঞানে অধিকার জন্মে, গীতায় শ্রীভগবানের উক্তিতে দেখা যায়। “সর্ব্বং কর্ম্মাখিলং পার্থ” জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে। কিন্তু জ্ঞানের চূড়ান্ত ফল, জ্ঞান, জ্ঞেয়, জ্ঞাতা তিনেরই সর্বনাশ ? রূপ নির্বিশেষ গতি। শুভকর্মের অনুষ্ঠানের ফলে স্বর্গাদিলোক লাভ হইয়া থাকে ও পুণ্যক্ষয়ে পুনরায় মর্ত্যলোকে ফিরিতে হয় এবং এইভাবে কামকামী ব্যক্তিগণকে এই মায়িক ব্রহ্মাণ্ডেই অবস্থান করিতে করিতে স্বকৃত কর্মফল ভোগ করতে হয়। ভগবদ্ভক্তগণ কীর্ত্তনীয়ঃ সদা হরিঃ মহা মন্ত্রের উপাসক। তাঁদের আরাধনার প্রণালি চরিতামৃতে এইরূপ দেখা যায়। নিজাভিষ্ট কৃষ্ণপ্রেষ্ঠ পাছে ত লাগিয়া। নিরন্তর সেবা করে অন্তর্মনা হইয়া তাঁহাদের চব্বিশ ঘন্টাই শ্রীভগবৎ সেবায় নিয়োজিত হয়। আত্মেন্দ্রিয় সুখের নিমিত্ত তাঁহাদের একটি মুহুর্তও দিবার সময় নাই। সেবা বিমুখজীবের সঙ্গ তাঁহাদের কাছে দুর্বিসহ। বিশেষত সগুণোপাসক বা ফলকামী জীবের সঙ্গকে তাঁহারা নরকাপেক্ষাও ঘৃণ্য বলিয়ে মনে করেন। এ বিষয়ে প্রচুর শাস্ত্র দৃষ্টান্তও দেখিতে পাওয়া যায়।
কাজেই যাঁহারা গুণাতীত পরব্রহ্মের উপাসক, সগুণোপাসকগণ চিরদিনই তাঁহাদের প্রতিবন্ধকতা করিতে থাকেন।দৃষ্টান্তের ও অভাব নাই। এমতস্থলে যে মাসটি অধিক হইল প্রকৃতি নিয়মাবদ্ধ স্মার্ত্তগণ তাহাকে পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। যেহেতু তাঁহাদের দ্বাদশ কৃত্য পূর্ব হইতেই নির্দিষ্ট রহিয়াছে। অপর পক্ষে যাঁহারা নিরন্তর ভগবদারাধনায় কাল যাপন করেন এবং পুণ্য কর্মগুলোকে মায়িক বন্ধন বলিয়া জানেন, তাঁহারা এই নির্মল মাসটির বিশেষ সমাদর করিলেও প্রকৃতি রাজ্যে তাহা মলিন মাস নামেই পরিত্যক্ত রহিল। তখন অধিমাসের পক্ষে কর্তৃপক্ষের নিকট শরণাগতকে হওয়াই স্বাভাবিক। ভগবান শরণাগতকে চিরদিনই বিশেষভাবে রক্ষা করেন, তাই অধিমাসকে নিজের সমস্ত সম্পদ দান করিয়া আত্মসম করিলেন ও স্বয়ং নিজ নামে অধিমাসের নামকরণ করিলেন, পুরুষোত্তম এবং অধিমাসকে সকল মাসের অধিপতি করিয়া স্বয়ংই তাঁহার মাতাত্ম্য নিজমুখে ঘোষণাপূর্বক আত্মপ্রেষ্ঠ ভক্তগণের করে সমর্পন করিলেন! ভক্তগণও কর্ম জড় স্মার্ত্ত সমাজের দৌরাত্ম্য নির্ম্মুক্ত এই পুরুষোত্তম মাসে অধিকতর প্রযত্নের সহিত পরমানন্দে গোলকবিহারী পুরুষোত্তমের সেবা করতে লাগলেন।
No Comment! Be the first one.