পরমসত্য বা সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে অনেকেরই অনেক প্রশ্ন থাকে। যখন আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর পাই, তখন আমাদের সন্দেহ, আশংকা, ভয়, অজ্ঞতা দূর হয়, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরুন- আগামীকার বৃষ্টি হবে কি হবে না ? অনেক দিন বৃষ্টির পর আমাদের মনে এ ধরনের প্রশ্নের উদয় হতেও পারে। কিন্তু এটি কোনো আধ্যাত্মিক সমস্যা নয়। অবশেষে দেখা গেল, বৃষ্টি বন্ধ হলো, সূর্যও দেখা গেল কিন্তু এ ধরনের প্রশ্ন যেমন- আমরা কে ? আমরা কোথা থেকে এসেছি ? মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাব ? এই পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন ? জীবন কী ? কে আমাদের সৃষ্টি করেছেন ? জীবনের উৎস কী ? পরমসত্য বা সৃষ্টিকর্তা আছে কি ? আত্মার দেহান্তর কীভাবে হয় ? ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের সমাধান পেলে আমরা জীবনের অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারি। এই সবই পারমার্থিক প্রাশ্ন। এসব প্রশ্নের সমাধান পেলে আমরা জীবনের অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারি। এই সবই পারমার্থিক প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর পারমার্থিক জ্ঞান অর্জনে সহায়ক। ভগবদগীতা হচ্ছে প্রশ্ন এবং উত্তরসমৃদ্ধ একটি আলোচনা। অর্জুন বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং কৃষ্ণ উত্তর দেন। অর্জুনের মুখ্য প্রশ্ন ছিল- তিনি কেন দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছেন এবং তিনি কেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ? তিনি এ সব প্রশ্নের সমাধান চেয়েছিলেন। অর্জুনের এরকম আরো অনেক পারমার্থিক প্রশ্ন ছিল।
কৃষ্ণভাবনামৃতে অধিক জনসংখ্যা সমস্যার সমাধান
সরকার অধিক জনস্ংখ্যা সমস্যা সমাধান করার জন্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির পৃষ্ঠপোষকতা করছে, সার্জিক্যাল অপারেশনের ব্যবস্থা করছে গর্ভনিরোধক ব্যবহার ও গর্ভনিরোধের অন্যান্য মারাত্মক উপায় গ্রহণ করতে উৎসাহিত করছে। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলন, হরিনাম গর্ভনিরোধক ব্যবহার ও গর্ভনিরোধের অন্যান্য মারাত্মক উপায় গ্রহণ করতে উৎসাহিত করছে। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলন, হরিনাম জপকীর্তন এবং আরও ভগবৎ সচেতন হওয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কামবাসনা কমে যায়। পারমার্থিক জীবনে যুক্ত হওয়ার দ্বারা আপনা আপনিই শুধু জনসংখ্যাই হ্রাস পাবে না, সাথে সাথে তাঁদের মানও বৃদ্ধি পাবে।
আমাদের আরো বেশি পারমার্থিক জগতের প্রয়োজন
যখন দুর্যোগ আসে, মানুষ তখন এর বাস্তবতাকে রোধ করার চেষ্টা শুরু করে। চিন্তা করতে থাকে, আমরা কী ভুল করলাম ? কখন বিপর্যয় ও সমস্যা আসে এ নিয়ে তারা গভীরভাবে ভাবতে থাকে। যারা পারমার্থিক জীবন ও কৃষ্ণভাবনামৃতে বেশ শিক্ষিত তাঁদের কৃষ্ণভাবনার উন্নতির জন্য এই অন্তদর্শন ভালো কাজ করে। আরো বেশি পারমার্থিক জগত দরকার আমাদের। এই জগৎ পুরোপুরি একমুখী; তা অত্যধিক জড়বাদী। তাই শ্রীল প্রভুপাদ ভারসাম্যপূর্ণ পারমার্থিক আদর্শ উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন। যেখানে থাকবে পারমার্থিকভাবে দায়িত্বশীল গৃহস্থ জীবন এবং তা প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী এবং অন্যান্য পরিচিত জনদের মাঝেও বিস্তৃতি লাভ করবে। ভাগবতমে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, আমরা বিভিন্নভাবে আমাদের সমস্যাগুলো এড়াত পারি। এর জন্য ভারসাম্যপূর্ণ পারমার্থিক জীবন পরিচালনা করা একান্ত প্রয়োজন। গ্রহস্থ জীবন সম্পর্কে শিক্ষালাভের পাশাপাশি অনাসক্ত ও আত্মত্যাগী হওয়ার শিক্ষা লাভ করে প্রত্যেকেই যখন সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে শ্রীল প্রভুপাদ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করার জন্য একত্রে সেবা করে তখন তা নিশ্চিত হয়।
অজ্ঞতা হচ্ছে সকল বন্ধনের কারণ
বর্তমান পৃথিবীতে আমরা প্রধানত যেসব সমস্যার সম্মুখীন, তার প্রধান হচ্ছে অজ্ঞানতা, খবরের কাগজ খুললে তা স্পষ্ট দেখা যায়। পূর্বসংস্কার, ভুল বোঝাবুঝি, নিষ্ঠুরতা, পরিবেশ সংরক্ষণে দায়িত্বহীনতা, নেতাদের সততার অভাব, ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির অভাব, ভালোবাসার অভাব- এর সবই হয় অজ্ঞানতার কারনে। আর অজ্ঞানতার প্রতিকার কী ? জ্ঞান, জ্ঞানই হচ্ছে অজ্ঞতা দূর করার প্রকৃত উপায়। ঠিক একইভাবে- অন্ধকার দূর করার উপায় কী ? আলো। বৈদিক শাস্ত্রে একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে। তমসো মা জ্যোতির্গময়, মানে, পারমার্থিক জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে তুমি অজ্ঞানের অন্ধকার থেকে বের হয়ে এসো।
পরম সত্য জানার উপায়
আধুনিক বিশ্বে, এই পরম সত্য সম্বন্ধে আলোচনা হয় না। কারণ এটি সাধারণ বুদ্ধিমত্তার বা গবেষণার বিষয় নয় কিন্তু ভারতীয় বৈদিক সংস্কৃতিতে, বিখ্যাত দার্শনিক বা যোগীরা বিভিন্ন যোগপন্থায় সেই জ্ঞানের অনুশীলন করতেন। যোগ শব্দের অর্থ হচ্ছে- সংযোগ। প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধ্যান প্রভৃতির দ্বারা তাঁরা সমস্ত সৃষ্টির আদি শক্তির সান্নিধ্য অনুভব করতেন। তাঁরা তাদের নিজস্ব পারমার্থিক স্থিতি উপলব্ধি করতে পারতেন। ভগবদগীতার শুরুতেই বলা হয়েছে যে, এই দেহের মৃত্যু হয় এবং পরিবর্তন সাধিত হয়। যেমন- আজকের একটি শিশু দশ বছর পর বালক হবে। আর ২৫ বছর বয়সে সে প্রাপ্তবয়স্ক হবে। এদেহ শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য প্রভৃতি দশায় পরিবর্তিত হয় কিন্তু দেহীর, কোনো পরিবর্তন হয় না।
ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, আমরা দেহের বিভিন্ন পরিবর্তন দর্শন করি কিন্তু আত্মা অপরিবর্তিত থাকে। যখন দেহ ধ্বংস হয় এবং বসবাসের অযোগ্য হয়, আত্মা বা জীবনীশক্তি এ দেহটি পরিত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করে। এটার শুরু হয়, যখন পুরুষের শুক্রাণু স্ত্রীগর্ভে অনুপ্রবিষ্ট হয়। বিজ্ঞান সেটা প্রমাণ করেছে। যদি আত্মা না থাকে, তবে জীবিত থাকা অসম্ভব। বেদে একেই চিৎশক্তি বলা হয়েছে। এই জড় জগৎ হচ্ছে অচেতন। যেমন- একটি টেবিলের কোনো চেতনা নেই কিন্তু কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে যদি আঘাত করা যায়, তবে সে সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া দেখাবে। আমরা অনুভব করতে পারি, ইচ্ছা করতে পারি, চিন্তা করতে পারি। চেতন ও অচেতন বস্তুর মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আসলে এ দেহটিও অচেতন। চেতন আত্মা এতে প্রবিষ্ট হওয়ায় এটি চেতনার লক্ষণ প্রকাশ করছে।
ভগবদগীতার পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, এই আত্মার অবস্থান হৃদ্দেশে। সেখানে অবস্থিত থেকেই আত্মা সমগ্র দেহে তাাঁর চেতনা বিস্তার করে রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে। এই রক্তপ্রবাহের ফলেই আমরা বিভিন্ন বিষয় অনুভব করতে পারি। যদি আমরা দেহের সাথে হাতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেই, তবে হাতটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। দেহের নিজস্ব কোনো ইন্দ্রিয় নেই, আত্মাতেই ইন্দ্রিয় রয়েছে, যা বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সবকিছু উপলব্ধি করতে পারে। দেহটি শুধু একটি যন্ত্রের মতো। আমাদের পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় রয়েছে, পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় রয়েছে, আর তার সাথে আছে মন। এগুলো যন্ত্রের মতো আত্মাকে এই দেহটিকে কর্মক্ষম করাতে সহায়তা করে। যখন আত্মা এদেহটি ত্যাগ করে, তখন সে মৃত। জীবিত আর মৃতদেহের এই পার্থক্য।
No Comment! Be the first one.