সারাবিশ্বই দেহাত্মবুদ্ধিতে মগ্ন। তাই এতে ভালো কিছু নেই। কৃষ্ণ একারণেই অর্জুনকে দেহাত্মবুদ্ধি ত্যাগ করে ধর্ম রক্ষার জন্য স্বীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে বলেছিলেন। শৈশব থেকেই আমরা দেহাত্মবুদ্ধিতে আবদ্ধ থাকি। দেহাত্মবুদ্ধি এতই কঠিনভাবে হৃদয়ে গ্রথিত আছে যে, কোনো ধর্মেই প্রকৃত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি সরাসরি নেই। এমনকি বেশির ভাগ ধর্মগুলো দেহাত্মবুদ্ধি কেন্দ্রিক। যদিও এদেহটি একদিন না একদিন ধ্বংস হবেই, তবুও সব সময় এই দেহটির দিকেই নজর রাখা হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞান, ধর্ম, রাজনীতি প্রভৃতি সবকিছুই এখন দেহকেন্দ্রিক। চিন্ময় আত্মা সম্পর্কে কোনো কথাই হচ্ছে না।
কৃষ্ণসেবার মহিমাঃ
আগেকার দিনগুলোতে আসামীদের জলে ডুবিয়ে শাস্তি দেওয়া হতো। যখন প্রায় দমবন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হতো, তখন তাকে কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস নিতে উপরে তোলা হয়। জড়বাদীদের অবস্থা ঠিক এরকম বিপন্ন। অর্জুন কৃষ্ণের সাথে তার সম্পর্ক বুঝতে পেরেছিল। তাই অর্জুনের যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও দুর্যোধনের যুদ্ধের উদ্দেশ্য একেবারে ভিন্ন। অর্জুন যেহেতু কর্মফলের প্রতি অনাসক্ত ছিল, তাই যুদ্ধ করাটা তার পক্ষে সেবা ছিল। কৃষ্ণ তাকে বলেছিলেন, তুমি শুধু আমার জন্য যুদ্ধ কর, তাতেই তুমি আমার কাছে ফিরে আসতে পারবে। এটাই হচ্ছে একজন ভক্তের বিশেষত্ব। জড়বাদীরা যেহেতু কৃষ্ণের সাথে সর্ম্পক রাখেনা তাই তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে সেটা মৃত্যুতে পর্যবসিত হয়। ভক্তদের মৃত্যুবরণ করতে হলেও মৃত্যুর পর সে শুধুমাত্র পঞ্চভৌতিক দেহটি ত্যাগ করে সিদ্ধদেহ লাভ করে ভগবানের কাছে ফিরে যায়।
অভক্ত সংঙ্গের প্রত্যাশা নয়ঃ
জড় জগতে সকলেই কৃষ্ণের সাথে নিত্য সম্পর্কের কথা ভুলে গিয়েছে। তাই তারা কৃষ্ণের পরমেশ্বরত্ব স্বীকার করে না। কৃষ্ণের ভগবত্তা না জেনে, নিজেকে কর্তা মনে করে বদ্ধজীবেরা তাদের জাগতিক সম্পদ বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট। একারণেই তাা প্রকৃতির আইন থেকে বাঁচতে পারে না। মাঝে মাঝে স্বর্গাদি উন্নত লোকে যায়, কখনো বা নরকাদি নিম্ন গ্রহে গিয়ে দুঃখ কষ্ট ভোগ করে।
মদনমোহনের উপর নির্ভরশীল হোনঃ
কেউই নিজের শক্তিতে স্বাধীনভাবে চলতে পারে না। দেহের সামান্যতম সমস্যায় আমাদের ক্লেশ শুরু হয়ে যায়। আমাদের কৃষ্ণের কৃপার ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই আমাদের ভক্তিমূলক সেবায় নিয়োজিত থাকাই বরং ভাল। জাগতিক কাজকর্মে যারা ব্যস্ত, তারা প্রকৃতপক্ষে মায়ার দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে। পরিণামে এসব কিছুর ফল তিক্ত হয়ে ওঠে। আমাদের পরিকল্পনা মতো কিছু হয় না। আমরা মনে করি, আমরা প্রকৃতির বাধ্য নই। বাস্তবে ঠিক তার উল্টো। অনেকেই বলতে পারে যে, ঈশ্বর নেই কিন্তু আসলে, তারা নিজেদের শক্তিতে ঠিকমতো চলতেও সক্ষম নয়। তাদের উচিত মদনমোহনের কৃপার ওপর নির্ভর করা এবং তাঁর শরণাগত হওয়া। ভক্তি জীবনের শুরুতে আমাদের অবশ্যই মদনমোহনের আরাধনা করা উচিত, যাতে আমরা ইন্দ্রিয় তৃপ্তির বাসনাশূণ্য হতে পারি।
সুসময়ের বন্ধু ত্যাগ করে প্রকৃত বন্ধুর শরণাপন্ন হোনঃ
জগতে অনেক সুসময়ের বন্ধু পাওয়া যায়, যারা টাকা-পয়সা বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা থাকলে বন্ধুত্ব দেখাতে আসে। এ সমাজে ধনী প্রতিপত্তিশীল ব্যক্তিদের পেছন পেছন এরকম অনেক বন্ধুকে ঘুরতে দেখা যায় কিন্তু যখন টাকা থাকে না, তাদেরকে আর দেখা যায় না। তাই কৃষ্ণ হচ্ছেন আমাদের প্রকৃত বন্ধু ও আত্মীয়। কিংবা যারা আধ্যাত্মিকতার স্তরে একে অন্যের সাথে যুক্ত, তারাও প্রকৃত বন্ধু কেননা এটা আত্মার সম্পর্ক। গজেন্দ্র তার পত্নী, সন্তান-সন্ততি ও অন্যান্য হাতির দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল কিন্তু কেউ তাকে কুমীরের হাত থেকে বাঁচাতে আসেনি। নিজের অসহায়তা উপলব্ধি করে, সে তখন সর্বদেবাদিদেব, সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ কর্তা পরমেশ্বর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করল। তার আন্তরিক প্রার্থনা শুনে ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং এসে তাকে উদ্ধার করলেন।
No Comment! Be the first one.