বৈদিক তত্ত্বজ্ঞান কৃষ্ণ থেকে অবরোহ পন্থায় গরুদেবের মাধ্যমে শিষ্যের কাছে প্রবাহিত হয়। এভাবে জ্ঞান প্রবাহের পর্যায়ক্রমিক শৃঙ্খলকে বলা হয় গুরু-পরম্পরা বা গুরু-শিষ্য পরম্পরা ধারা। ভগবদ্গীতার শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন-
এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ।
স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ।।
“এভাবে পরম্পরার মাধ্যমে প্রাপ্ত এ পরম বিজ্ঞান রাজর্ষিরা লাভ করেছিলেন। কিন্তু কালের প্রভাবে পরম্পরা ছিন্ন হয়েছিল এবং তাই সেই যোগ নষ্টপ্রায় হয়েছে।” এভাবে গুরু-শিষ্যের সম্বন্ধ কেবল শিষ্যের নিজ গুরুদেবের সঙ্গেই নয়; তার সম্পর্ক তার গুরুদেবের গুরু, তাঁর গুরুদেব, তাঁর গুরুদেব- এভাবে অবিচ্ছিন্ন পরম্পরাক্রমে স্বয়ং ভগবানের সঙ্গে। শ্রীল প্রভুপাদ গুরু পরম্পরা প্রসঙ্গে বলেছেন- “যথার্থ জ্ঞানকে বলা হয় পরম্পরা; অর্থাৎ যে জ্ঞান শ্রদ্ধা সমন্বিত শরণাগতির মাধ্যমে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় অবরোহ পন্থায় লাভ হয়। পরম্পরা ধারায় মহান আচার্যদের চিন্তাধারা গ্রহণ করা মানসিক জল্পনা-কল্পনার পন্থা থেকে অনেক সহজ। পূর্বতন আচার্যদের উপদেশ স্বীকার করে তা অনুসরণ করাই সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা। তখন ভগবদুপলব্ধি অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। এ সহজ পন্থাটি অনুসরণ করার ফলে জড়া প্রকৃতির কলুষ থেকে মুক্ত হওয়া যায় এবং অনায়াসে দুঃখদুর্দশাপূর্ণ ভবসাগর উত্তীর্ণ হওয়া যায়। মহান আচার্যদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জড়-জগতের কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত জীব বা পরমহংসদের সঙ্গ করা উচিত। প্রকৃতপক্ষে, আচার্যদের উপদেশ অনুসরণ করার ফলে জড়-জগতের সমস্ত কলুষ থেকে সর্বদাই মুক্ত থাকা যায় এবং এভাবে জীবনের চরম লক্ষ্যে উপনীত হয়ে জীবন সার্থক করা যায়।”
এভাবেই বৈদিক জ্ঞান যুগ যুগ ধরে গুরু পরম্পরার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে আসছে। এ বিষয়টি একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে-
কয়েকজন ব্যক্তি একটি আমগাছে উঠে আম পেড়ে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের দিচ্ছেন। কিন্তু আমগুলো সুপক্ব ও সুকোমল হওয়ায় মাটিতে ফেললে নষ্ট হয়ে যাবে, তাই গাছে ওঠা ব্যক্তিদের মধ্যে সরাসরি হস্তান্তরের মাধ্যমে একে একে তা নিচে থাকা ব্যক্তিদের হাতে অর্পন করা হচ্ছে। তারা আবার তা সরাসরি অন্য ব্যক্তির হাতে অর্পণ করছে।
বৈদিক জ্ঞান হলো সুপক্ব আম্রফলের মতো; কোনো প্রকার সংযোজন-বিয়োজন ছাড়াই যত্ন সহকারে তা সরাসরি বিভিন্ন শাখায় অবস্থানরত গুরুবর্গের হাতে অর্পিত হতে হতে ভক্তগণের মধ্যে পরিবেশিত হচ্ছে। যাঁরা সে জ্ঞান গ্রহণ করছেন, তাঁরা আবার স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তা সাধারণের মাঝে বিতরণ করছেন। সেক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতা থাকলেও তা একই গাছের ফল। যেসকল ভাগ্যবান ব্যক্তি এ ধারার সাথে যুক্ত, তাঁরাই এ সুপক্ব ফল আস্বাদন করতে পারবেন। বৈদিক জ্ঞান অবিকৃত ও ধারাবাহিকভাবে অর্পণের এ শৃঙ্খলকেই বলে পরম্পরা। আর ভিন্ন ভিন্ন শাখা থেকে যে পরম্পরা নেমে এসেছে, তাকে বলা হয় সম্প্রদায়। সুতরাং বৈদিক জ্ঞান লাভ করার জন্য অবশ্যই পরম্পরায় অধিষ্ঠিত হতে হবে।
No Comment! Be the first one.