গুরুদেবের যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের শাস্ত্রের শরণাগত হতে হবে। অর্থাৎ শাস্ত্রে গুরুদেবের যোগ্যতার বর্ণনা করা হয়েছে, তা কারো থাকলে আমরা তাঁকে প্রামাণিক উৎস হিসেবে স্বীকার করে নিতে পারি।
যিনি স্বয়ং ভগবান হতে গুরু-শিষ্য পরম্পরা ধারায় শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ভগবৎ প্রদত্ত পরম তত্ত্বজ্ঞান শ্রবণ করে সে জ্ঞান কোনোরকম পরিবর্তন না করে অভ্রান্তভাবে প্রদান করেন তিনিই যথার্থ গুরু। তিনি ভ্রম, প্রমাদ, বিপ্রলিপ্সা, করণাপাটব-বদ্ধজীবের এ চারটি ত্রুটি থেকে মুক্ত। শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/৩/২১) বলা হয়েছে-
তস্মাদ্ গুরুং প্রপদ্যেত জিজ্ঞাসুঃ শ্রেয়ঃ উত্তমম্।
শাব্দে পরে চ নিষ্ণাতং ব্রহ্মণ্যুপশমাশ্রয়ম্।।
অতএব কেউ যদি আন্তরিকভাবে প্রকৃত জ্ঞান লাভের অভিলাষ করেন, তাহলে তাঁকে অবশ্যই দীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে সদ্গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। সদ্গুরুর যোগ্যতা হচ্ছে যে, তিনি গভীরভাবে শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত উপলব্ধি করেছেন এবং অন্যদেরও সেসব সিদ্ধান্ত বিষয়ে প্রত্যয় উৎপাদনে সক্ষম। যাঁরা জড় সুখ-সুবিধা অগ্রাহ্য করে পরমেশ্বর ভগবানের শরণ গ্রহণ করেছেন, সে ধরনের মহান ব্যক্তিদেরই যথার্থ গুরু বা সদ্গুরু বলে জানতে হবে।
গুরুদেব অবশ্যই শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্তসমূহের সুগভীর তত্ত্ববোধ বা উপলব্ধি অর্জন করেছেন। কেননা, তিনি পরমতত্ত্ব বা পরমসত্য সম্বন্ধে শ্রবণ করেছেন, তাঁকে বুঝতে পেরেছেন এব অনুশীলনের মাধ্যমে উপলব্ধি করেছেন। তিনি অবশ্যই ভগবদ্ভজনে ব্রতী হবেন। তিনি শাস্ত্রোক্তির দ্বারা এবং বর্তমান ও পূর্বতন সত্যদ্রষ্টা মহাজনগনের উক্তির দ্বারা তাত্ত্বিক সিদ্বান্তসমূহের সত্যতা, প্রামাণিকতা প্রতিপাদন করতে সমর্থ হবেন।
তাঁর ইন্দ্রিয়গুলো অবশ্যই তাঁর বতীভূত থাকবে, তিনি হবের সংযতেন্দ্রিয়। যদি গুরুদেবের ইন্দ্রিয়গুলো অসংযত থাকে এবং তিনি যদি তাঁর শিষ্যদের ইন্দ্রিয় সংযমের শিক্ষা না দেন, তাহলে তিনি গুরু হবার যোগ্য নন।
ষোড়শ শতাব্দীর এক বৈদিক দার্শনিক এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অগ্রগণ্য শিষ্য শ্রীপাদ রূপ গোস্বামী তাঁর শ্রীউপদেশামৃত গ্রন্থে সদ্গুরুদেবের বিশেষ ছটি লক্ষণের উল্লেখ করেছেন- যে সংযমী ব্যক্তি বাক্যের বেগ, ক্রোধের বেগ, জিহ্বার বেগ, মনের বেগ, উদর এবং উপস্থের বেগ- এই ষড় বেগ দমন করতে সমর্থ, তিনি সমগ্র পৃথিবী শাসন করতে পারেন।” তিনি হবেন সত্যনিষ্ঠ, সকলের সুহৃদ, অনিন্দুক এবং সকল জীবের কল্যাণকামী। তিনি নিজে তাঁর ইন্দ্রিয়জ জল্পনা দ্বারা কোনোরকম মনোধর্মী তত্ত্ব উদ্ভাবন করবেন না; তিনি কেবল তাঁর গুরুদেবের নিকট হতে প্রাপ্ত বাণী যথাযথ ও নির্ভেজালভাবে উপস্থাপন করবেন।
প্রখর বুদ্ধিমত্তা থাকলেও যদি কারো চরিত্র সন্দেহজনক হয়, তিনি যদি স্বার্থ-বাসনাযুক্ত ও ভোগলিপ্সু হন, তিনি গুরুপদবাচ্য নন। যেহেতু ভগবানই গুরু-পরম্পরার আদি উৎস যিনি পরম তত্ত্বজ্ঞান প্রদানে সমর্থ এবং যেহেতু ভগবান হতে পরম্পরা ধারায় ঐ একই জ্ঞান অবিকৃতভাবে প্রবাহিত হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য সে জ্ঞান অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা সেই পরম সত্য উপলব্ধি করতে পারি এবং আমাদের জীবন সার্থক করতে পারি। সভ্য মানুষের কর্তব্য হচ্ছে এরূপ প্রামাণিক ও তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তিকে গুরুরূপে বরণ করা, তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করা এবং এভাবে জীবনকে সফল করে তোলা। ঠিক যেমন আলো জ্বালানো মাত্রই ঘন অন্ধাক ঘর নিমেষেই আলোকিত হয়ে ওঠে, তেমনি দিব্যজ্ঞানের জ্যোতিঃপ্রভার দ্বারা অজ্ঞান-তমসাবৃত হৃদয়-কন্দর আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
বিতর্কিত বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য পরীক্ষা ও সামঞ্জস্যবিধানের ব্যবস্থা রয়েছে-গুরু-সাধু-শাস্ত্র। গুরুদেবের শিক্ষা অবশ্যই সাধুর (অর্থাৎ গুরু-পরম্পরার পূর্বতন আচার্যগনের) সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রত্যক্ষভাবে শাস্ত্রানুগ হতে হবে। কেউ তাঁর গুরুদেবের কাছ থেকে যে জ্ঞান শ্রবণ করেছেন, তিনি তার প্রামাণিকতা যাচাই করতে পারেন- ঐ তত্ত্ব পরম্পরা ধারার অন্যান্য পূর্বতন আচার্যবৃন্দ প্রদত্ত জ্ঞানের সঙ্গে এবং শাস্ত্রধূত জ্ঞানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সুসামঞ্জস্য কি না, তা বিচারের মাধ্যমে।
No Comment! Be the first one.