পরমহংস শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজি মহারাজের আবির্ভাব স্থান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত টেপাখোরার নিকটে পদ্মানদীর তটবর্তী “বাগযান” গ্রামে। তাঁর আর্বিভাবকাল অষ্টবিংশ শতাব্দীতে, প্রায় দেড়শত বছর পূর্বে। তাঁর পিতা- মাতার নাম জানা যায়নি। বাবাজি মহারাজের পিতার দেয়া পূর্বনাম ছিল “বংশীদাস।” তাঁর বিশেষ পরিচয়- তিনি বিশ্বব্যাপী শ্রীচৈতন্য মঠ ও শ্রীগৌড়ীয় মঠসমূহের প্রতিষ্ঠাতা নিত্যলীলা প্রবিষ্ট ওঁ বিষ্ণপাদ শ্রীশ্রীমৎ ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুরের দীক্ষাগুরু।
সমাজের তৎকালীন প্রথা অনুসারে পিতামাতা বাল্যকালেই বংশীদাসের বিবাহকার্য সম্পাদন করলেও বংশীদাস সর্বদা সংসারবিরক্ত ও ভগবদবিরহ-বিহ্বল অবস্থায় গৃহে অবস্থান করতেন। পত্নীবিয়োগের পর তিনি কঠোর বৈরাগ্যের সাথে ভজনানন্দী ঠাকুরের ন্যায় ভগবদ্ভজনের জন্য শ্রীমৎ ভগবতদাস বাবাজি মহারাজের নিকট পরমহংস বাবাজির বেশ গ্রহণ করে “শ্রীল গৌরকিশোরদাস বাবাজি মহারজ” নামে খ্যাত হন। শ্রীমৎ ভাগবতদাস বাবাজি মহারাজ- বৈষ্ণবসার্বভৌম শ্রীল জগন্নাথদাস বাবাজি মহারাজের বেশ-শিষ্য ছিলেন। বেশাশ্রয়ের পর শ্রীল বাবাজি মহারাজ ত্রিশ বছরব্যাপী ব্রজমণ্ডলের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কঠোর ভজন-সাধন করেন। তবে মাঝে মাঝে তিনি উত্তর ভারতের ও গৌড়মণ্ডলের তীর্থসমূহ দর্শন করে আসতেন। তীর্থ-পর্যটনকালে বাবাজি মহারাজের সাথে শ্রীক্ষেত্রে শ্রীস্বরূপদাস বাবাজি, কালনায় শ্রীভগবানদাস বাবাজি ও কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদাস বাবাজির সাক্ষাৎ হয়।
১৩০০ বঙ্গাব্দে ফাল্গুন মাসে, যখন শ্রীমন্মহাপ্রভুর আবির্ভাবস্থলী শ্রীমায়াপুরে যোগপীঠের প্রকাশ হয়, শ্রীল জগন্নাথদাস বাবাজি মহারাজের নির্দেশক্রমে শ্রীল গৌরকিশোরদাস বাবাজি মহারাজ ব্রজমণ্ডল থেকে গৌড়মণ্ডলে আসেন। তাঁর অপ্রকটকাল পর্যন্ত তিনি মহাপ্রভুর লীলাস্থলী শ্রীনবদ্বীপমণ্ডলের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেছিলেন। তিনি অপ্রাকৃত নেত্রে নবদ্বীপমণ্ডলের আধিবাসীদের ধামবাসীরূপে দর্শন করে মাধুকরী ভিক্ষালব্ধ দ্রব্য তাঁদের পরিত্যক্ত মৃৎভাণ্ডে রণ্ধন করে কোনোমতে জীবনধারণ করতেন।
১৮৯৮ সালে গোদ্রুমদ্বীপস্থ শ্রীস্বানন্দ-সুখদকুঞ্জে শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজি মহারাজের সাথে সরস্বতী ঠাকুরের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সে সময় শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজি মহারাজের শ্রীমুখে ব্যাকুল হৃদয়ে কীর্তিত গান শুনে শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর মুগ্ধ ও প্রেমাবিষ্ট হয়ে পড়েন।
১৯০০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের নির্দেশক্রমে গোদ্রুম স্বানন্দ-সুখদকুঞ্জে শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজি মহারাজের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করলেন।
১৩২২ বঙ্গাব্দ ৩০ কার্তিক শেষরাতে পরমহংস শ্রীল গৌরকিশোরদাস বাবাজি মহারাজ নিত্যলীলায় প্রবিষ্ট হন। বাবাজি মহারাজ অপ্রকটের পূর্বে কুলিয়ার রানীর ধর্মশালায় অবস্থান করতেন। শ্রীল সরস্বতী ঠাকুর কুলিয়ার চড়ার উপর ১৩২২ বঙ্গাব্দ ১ অগ্রহায়ণ শ্রীউত্থান একাদশী তিথিতে মধ্যাহ্নকালে বৈষ্ণবস্মৃতির বিধান অনুসারে স্বহস্তে বাবাজি মহারাজের সমাধিকৃত্য সমাপন করলেন। যশোর জেলার লোহাগড়ানিবাসী পোদ্দার মহাশয় সমাধির স্থানটি প্রদানকালে বলেছিলেন, উক্ত স্থানের প্রতি তাঁর কোন অধিকার থাকবে না। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর প্রতিশ্রুতি বাক্য বিস্মৃত হয়ে উক্ত স্থানের প্রতি আধিপত্য স্থাপন করে নানা প্রকার অবৈধ কার্যের ইন্ধন দিলে দৈববশত সমাধিস্থানটি ক্রমশ গঙ্গাগর্ভে চলে যেতে থাকে। শ্রীল সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ ৫ ভাদ্র শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজি মহারাজের চিন্ময় সমাধি গঙ্গাগর্ভ হতে উত্তোলন করে শ্রীবৈতন্যমধ্যে রাধাকুণ্ডের তটে আনয়ন করলে ২ আশ্বিন, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে পুনঃস্থাপিত করন।
No Comment! Be the first one.