বৃন্দাবন ধামে আমি বসে আছি একা।
এ ভাবনা মধ্যে মধ্যে দেয় মোরে দেখা।।
আছে মোর স্ত্রী-পুত্র কন্যা নাতি সব।
কিন্তু অর্থ নাই বলি’ বিফল বৈভব।।
প্রকৃতির নগ্নরূপ দেখালে শ্রীকৃষ্ণ।
তব কৃপাবলে আজ হয়েছি বিতৃষ্ণ।।
“যস্যাহমনুগৃহ্নামি হরিষ্যে তদ্ধনং শনৈঃ।”
কৃপাময়ের এই কৃপা বুঝিলাম কৈ? ।। ১ ।।
অর্থহীন দেখি’ মোরে ছেড়েছে সবাই।
কুটুম্ব-আত্মীয় আর বন্ধু জন ভাই।।
দুঃখ হয় হাসি পায়, একা বসি হাসি।
মায়ার সংসার এই কাকে ভালবাসি?
কোথা গেল মাতা-পিতা আর স্নেহময়।
কোথা গেল জ্যেষ্ঠ যারা স্বজনাদি হয়।।
তাদের খবর কেবা দেবে মোরে বল।
নামে মাত্র তাদের সংসার রয়ে গেল ।। ২ ।।
সমুদ্রের ফেনা যেন ক্ষণে সৃষ্টি ক্ষণে লয়।
মায়ার সংসারে খেলা সেইভাবে হয়।।
কেহ নহে পিতা-মাতা আত্মীয়-স্বজন।
সবাই ফেনার মতো থাকে অল্পক্ষণ।।
সমুদ্রের ফেনা যেমন সমুদ্রে মিশয়।
পঞ্চভূতের দেহ তথা হয়ে যায় লয়।।
কত দেহ এইভাবে ধরয়ে শরীরী।
অনিত্য শরীরে মাত্র আত্মীয় তাহারি ।। ৩ ।।
আত্মীয় সবাই ভাই, আত্মার সম্বন্ধে।
আত্মীয়তা নাহি হয় মায়াময় গন্ধে।।
সকলের আত্মা যিনি স্বয়ং ভগবান।
তাঁহার সম্বন্ধে বিশ্বে সবাই সমান।।
আত্মীয় তোমার ভাই, যত জীবকোটি।
কৃষ্ণের সম্বন্ধে তারা হয় পরিপাটি।।
‘কৃষ্ণ ভুলি সেই জীব’ ভোগবাঞ্ছা করে।
মায়ার সংসার তাই জাপটিয়া ধরে ।। ৪ ।।
কর্মফলে আসে সব নানা বেশ ধরি।,
বেশেতে মজিয়া থাকে ভুলিয়া শ্রীহরি।।
অতএব মায়া তারে দেয় বহু দুখ।
দুঃখে হাবু ডুবু তবু তাহে মনে সুখ।।
চিররোগী দুঃখ-ভোগী শয্যাতে শুইয়া।
‘ভাল আছি আজ’ কহে হাসিয়া হাসিয়া।।
হাসি পায় তার ‘ভাল থাকার’ কথায়।
মায়াবদ্ধ জীবের ভাল এইভাবে হয় ।। ৫ ।।
কত ‘প্ল্যান’ করে তারা ভাল থাকিবারে।
প্রকৃতি ভাঙ্গিয়া দেয় সব বারে বারে।।
“দৈবী হ্যেষা গুণময়ী” ভগবানের মায়া।
‘ভাল থাকার’ অর্থ বুঝ ভাল ক’রে ভায়া।।
কেহ ‘ভাল’ নাই হেথা ‘তবু ভাল’ বলে।
এইভাবে মায়া সব বদ্ধজীবে ছলে।।
ছলনায় ভুলি জীব সর্বদা মশগুল।
মায়া লাগি মরে তবু ভাঙ্গে নাকো ভুল ।। ৬ ।।
বার বার ‘প্ল্যান’ করি বার বার ভাঙ্গে।
কখন ভূমিতে পড়ি কখন ত’ পঙ্কে।।
এইরূপ ব্রহ্মাণ্ড-ভরি (জীব) করয়ে ভ্রমণ।
গুরু-কৃষ্ণ-কৃপায় পায় ভক্তি-নিত্যধন।।
সেই ধন মিলে যদি আর ধন ছাড়ে।
অনায়াসে চয়ে যায় সংসারের পারে।।
ভবপারে আছে চিদ্-বৈচিত্র্য অপার।
নিত্য শান্তি নিত্য সুখে করয়ে বিহার ।। ৭ ।।
বাতুল কহয়ে-“সেথা সব নিরাকার।”
নির্বিশেষ তিনি যেন শূণ্যের প্রকার।।
রসের ভাণ্ডারী তিনি “রসো বৈ সঃ।”
রসিক ভাবুক সেবে হই তাঁর বশ।।
শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য রস আর।
সর্বরস শ্রেষ্ঠ মাধুর্য রস সার।।
চিদ্-জগতে ‘রস’ সব হয় উপাদেয়।
মায়াতে তার ছায়ামাত্র কিন্তু সব হেয় ।। ৮ ।।
কৃষ্ণ যেই ভজে সেই হয়ত’ চতুর।
মায়া যেই ভজে সেই হয়ত’ ‘ফতুর’।।
‘ফতুর’ হইবার লাগি অনিত্য বিলাস।
সম্বন্ধ-জ্ঞান-হীনের হয় কর্মবন্ধ ফাঁস।।
অর্জুন করয়ে যুদ্ধ (আর) দুর্যোধন করে।
অর্জুন ভক্ত-শ্রেষ্ঠ, দুর্যোধন মরে।।
এক যুদ্ধ-ক্ষেত্রে দুই প্রিয়াপ্রিয় হয়।
বুদ্ধিমান লোক যেই বুঝিতে পারয় ।।৯।।
‘সম্বন্ধ’ জানিয়া যেবা জীবন-যুদ্ধ করে।
সেই ত’ বাঁচিয়া থাকে আর সব মরে।।
‘সম্বন্ধ’ না জানি’ যেবা আন্ পথে ধায়।
কৃষ্ণপ্রীতি নাহি মিলে বৃথা জন্ম যায়।।
কৃষ্ণ সে ‘সম্বন্ধ’ আদি ভাল করে বুঝ।
সে সম্বন্ধ রাখি তুমি মায়া সাথে যুঝ।।
তাহা ছাড়ি’ হয় যেবা জ্ঞান-কর্ম-বীর।
মোক্ষ নাহি পায় তারা হয় ত’ অস্থির ।।১০।।
নামে-মাত্র মহাধীর, সকলে অশান্ত।
ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধিকামীর ইন্দ্রিয় অদান্ত।।
অদান্ত ইন্দ্রিয় নহে যোগবলে বশ।
কত মুনি যোগী সব হয়েছে বিবশ।।
হৃষীকেশ-সেবা বিনা হৃষীক-দমন।
করমের ফের সব ভুঞ্জায় শমন।।
যোগেতে ইন্দ্রিয়-সংযম কভু নাহি হয়।
আগম-পুরাণে তাহা ভুরি-ভুরি কয় ।।১১।।
যোগীর আসনে বসেছিল বিশ্বামিত্র।
জন্ম দিল শকুন্তলা সুন্দরী পবিত্র।।
এইভাবে যোগভ্রষ্ট জ্ঞানীর কি কথা।
কর্মী সব মূঢ়-জন ব্যথিত সর্বথা।।
কৃষ্ণ যারে কৃপা করি’ উপদেশ দেন।
তিনি ত’ অর্জুন-সম ভাগ্যবান হন।।
আপনার সুখ-লাগি যেবা যুদ্ধ করে।
দুর্যোধনের মতো সে সবংশেতে মরে ।।১২।।
কৃষ্ণের লাগিয়া যেবা নিত্য যুদ্ধ করে।
ঋদ্ধি-সিদ্ধি, জ্ঞান তার মুষ্টির ভিতরে।।
গীতার উপদেশ ভাই বুঝ ভাল করি।
পাইবে কৃষ্ণের কৃপা ভজিবে শ্রীহরি।।
সর্বগুণে সুসম্পন্ন ভক্তজন হয়।
অহিংসা অক্রোধ তাঁর কাছে কিছু নয়।।
ভক্তদ্বারে জীবে শিক্ষা দিবেন শ্রীহরি।
তাহার সহায় হৈল ‘পার্থ’ নামধারী ।।১৩।।
সাজিল অর্জুন যেন মায়াবদ্ধ নর।
মোহিতের ন্যায় হৈল পাণ্ডব-সোদর।।
আত্মীয়-স্বজন হিংসা, পরে রাজ্য-ভোগ।
ইথে কিবা সুখ-পার্থ দেখাইলা শোক।।
সেইত; ‘দেহাত্মবুদ্ধি’ আত্মীয়-জ্ঞান ক’রে।
ক্ষত্রিয় হইয়া স্নেহে যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়ে।।
মোহ দেখি’ কৃষ্ণ তাঁর করিল নিন্দন।
অতএব অর্জুন কৈল শিষ্যত্ব গ্রহণ ।।১৪।।
শিষ্য হইয়া করে যেই গীতার শ্রবণ।
ঘুচিবে অজ্ঞান আর সংসার-বন্ধন।।
সংসার ঘুচিল কিন্তু বাহ্য-ন্যাসী নয়।
গীতার তাৎপর্যে গৃহী এরূপ বুঝায়।।
‘করিষ্যে বচনং তব’ সেই মন্ত্র-সিদ্ধি।
অতএব যুদ্ধে তাঁর হ’ল যশোবৃদ্ধি।।
বৈষ্ণব নিরীহ সব মালা জপ করে।
এ কোন্ বৈষ্ণব অর্জুন সংসার-ভিতরে ? ১৫।।
‘নির্দ্বন্দ্ব’ বৈষ্ণব শুধু জপ করে মালা।
বলয়ে এইরূপ যা’রা খায় মনকলা।।
বৈষ্ণব নিরীহ, আকৃতদ্রোহ, হয়ত’ স্বভাবে।
কিন্তু নহে হীনবীর্য যথা লোক ভাবে।।
ভারতের দুই যুদ্ধে দুই মহাশয়।
বৈষ্ণবের অগ্রণী তারা করিল বিজয়।।
নিজেন্দ্রিয় তৃপ্তিবাঞ্ছায় যুদ্ধ নাহি করে।
বৈষ্ণব বলিয়া তাই বিদিত সংসারে ।।১৬।।
বৈষ্ণব না দেখিয়া বলে বৈষ্ণব নিষ্ক্রিয়।
বৈষ্ণব ‘প্রভুর’ সেবায় সদাই সক্রিয়।।
প্রাণহীন কনিষ্ঠ সেই সেবা নাহি করে।
প্রতিষ্ঠার তরে থাকে নির্জনের ঘরে।।
বৈষ্ণব-প্রণম্য শ্রীল নিত্যানন্দ রায়।
মার খায়, প্রেম দেয় যথায় তথায়।।
চক্রপানি গৌরহরি সেথা করিল শাসন।
বৈষ্ণব-বিদ্বেষী তবে হইল দমন ।।১৭।।
আপনি আচরি ‘প্রভু’ জীবেরে শিখায়।
আপন বঞ্চক যেই সেই নির্জনে ভজয়।।
জগৎ ভরিয়া গেল জগাই-মাধাইয়ে।
নিত্যানন্দ বংশ বাড়ায় শিষ্য-সম্প্রদায়ে।।
খায় দায় থাকে বেশ হয়ে চিন্তাহীন।
বৈষ্ণবের উচিত নহে থাকা দায়হীন।।
“মাধুর্য কাদম্বিনী”-গ্রন্থ চক্রবর্তী গায়।
সিদ্ধান্ত দেখহ তথা কিবা তাঁর ‘রায়’ ।।১৮।।
ভক্তি অহৈতুকী হয় স্বপ্রকাশিত।
নিত্যসিদ্ধ বস্তু কিন্তু আছে আবরিত।।
মধ্যম-অধিকারী-বৈষ্ণব কৃপা ত’ করিয়া।
অবৈষ্ণবে করে কৃপা ভক্তি জাগাইয়া।।
বৈষ্ণবের বশ হন স্বয়ং ভগবান।
বৈষ্ণবের কৃপায় মুগ্ধ হয় আগুয়ান।।
বৈষ্ণব জাগাতে পারে ঘুমন্ত জগৎ।
তাঁরই কৃপায় হয় পাপীরা ভকত ।।১৯।।
অতএব তাঁর নহে ‘নির্জন-ভজন’।
কনিষ্ঠ-অধিকার এই জগৎ-বঞ্চন।।
বড় বড় নামজাদা বৈষ্ণব সজ্জায়।
পাদ্রী সাহেব আসি’ মিলে সব তায়।।
পুছিল শ্রীকৃষ্ণলীলা বৃন্দাবন-মাঝ।
না বুঝাল তা’রে তত্ত্ব বৈষ্ণব-সমাজ।।
কনিষ্ঠ-অধিকারী সব শাস্ত্র নাহি বুঝে।
নির্জনে ভজনে শুধু রুটি-চানা খুঁজে ।।২০।।
গুরুদেব বলেছিল-কনিষ্ঠ এ-সব।
এতদিনে বুঝিলাম তাঁর বাণী-রব।।
“শাস্তযুক্ত্যে সুনিপুণ দৃঢ় শ্রদ্ধা যা’র।
উত্তম-অধিকারী সেই তরায় সংসার।।”
পতিতপাবন তিনি জগতেতে খ্যাতি।
এ’ পতিতে উদ্ধারহ তবে ত’ সুখ্যাতি।।
কলিকালের জীব সব পতিত অধম।
দেখিয়াও নাহি দেখে ইহা কি রকম ।।২১।।
মহাবদান্য ঈশ্বর-শ্রীগৌরসুন্দর।
তাঁহার অমৃতবাণী মধুর মুখর।।
ভারত ভূমিতে জন্ম হইল যাঁহার।
তাঁহার বাণীতে কর পর-উপকার।।
নির্জনে আস্বাদন সে ত’ প্রভুর লীলা।
লীলা অনুকরণ নহে বৈষ্ণবের খেলা।।
সেবাকার্য বৈষ্ণবের নহে আস্বাদন।
জড় দেহে আস্বাদন নহে সম্ভাবন ।।২২।।
দেহাত্মবুদ্ধি যার সেই জড় দেহ।
সেই দেহে আস্বাদন নাহি করে কেহ।।
বৈষ্ণবেতে জাতিবুদ্ধি প্রবল প্রচুর।
লীলা-আস্বাদনে কিন্তু বড় বাহাদুর।।
ডাকঘরের কেরাণী (এক) গোঁসাই ঠাকুর।
বাবাজী প্রণাম করে তাহারে প্রচুর।।
গোঁসাই ঠাকুর করে জাতি-অভিমান।
নিত্যানন্দ প্রভু বরে করে খান খান ।।২৩।।
এই কার্য দেখিতেছি বৃন্দাবন মাঝ।
অতএব বুঝি হেথা আছে কিছু কাজ।।
প্রাকৃত-সহজিয়া সব ব্যভিচার করে।
পরস্ত্রী ল’য়ে লীলা আস্বাদন করে।।
এ নহে বৃন্দাবন-ধাম ভাব সদা মন।
গোস্বামীর পাদপদ্ম করহ স্মরণ।।
ছয় ‘গোঁসাই আসি’ যথা ধর্ম প্রচারিল।
মহাপ্রভু-আজ্ঞায় সব ভক্তি বিস্তারিল ।।২৪।।
নিত্যসিদ্ধ পার্ষদ সব রাধাকৃষ্ণ স্মরে।
তাঁদের স্মরণ জীবের সর্ব পাপ হরে।।
অনুকরণ করি’ যদি সেই ভাব ধরে।
মায়া-কবলিত হয় সংসার না তরে।।
প্রচার করহ সদা জীব ঘরে ঘরে।
সফল হইবে জীবন প্রচারের দ্বারে।।
‘শ্রীদয়িত দাস’-প্রভু দেনি এই শিক্ষা।
‘কর উচ্চৈঃস্বরে নাম’ এই তাঁর দীক্ষা ।।২৫।।
কীর্তনের অঙ্গ শুধু নহে ঢাক-ঢোল।
আধুনিক ধারায় নহে কীর্তনের রোল।।
হরিসেবায় অনুকূল সকলই মাধব।
ত্রিজগরে ভোক্তা হয় একলা যাদব।।
মায়ার বৈভব যত রেডিওর শব্দ।
কীর্তনের দ্বারা সদা কর তাহা স্তব্ধ।।
মায়ার কচ্কচি সব সংবাদের পত্র।
কীর্তন করহ তাহে জগতে সর্বত্র ।।২৬।।
ঘরে বসে’ চেঁচাইয়া পিত্তবৃদ্ধি করি।
কোটি জন্মেও সন্তুষ্ট হবে না শ্রীহরি।।
শ্রীহরি নহে কারে বাবার সম্পত্তি।
‘খোঁয়াড়ের’ বাহির হও, না কর আপত্তি।।
সব শ্রীহরির, আর শ্রীহরি সবার।
কর উচ্চৈঃস্বরে কীর্তন এ শিক্ষা তাঁর।।
কীর্তন-প্রভাবে হ’বে স্মরণ আপনি।
নির্জন-ভজন সেই হৃদয়ে তখনি ।।২৭।।
Hare Krishna Prabhu ebhabe Bhajan ar gurutto purno post share korle upokrito hoi