শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ করার সময় যখন শ্রীশ্রীজগন্নাথ পুরীধামে শ্রীমন্দির-নিকটে নারায়ণ ছাতা নামক ভবনে বাস করছিলেন, তাঁর গৃহে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের (১২৮০ বঙ্গাব্দের) ৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার মাঘী কৃষ্ণা পঞ্চমী তিথিতে আবির্ভূত হন। তাঁর মায়ের নাম ছিল শ্রীমতি ভগবতী দেবী। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর শ্রীবিমলা দেবীর প্রসাদ দ্বারা শিশুর অন্নপ্রাশন করিয়ে নামকরণ করলেন বিমলাপ্রসাদ।
শ্রীশ্রীসরস্বতী ঠাকুরের আবির্ভাবের ছয় মাস পর ছিল রথযাত্রা। এই রথযাত্রার সময় তিন দিন শ্রীজগন্নাথের রথ বড় দাঁড়ের উপর সরস্বতী ঠাকুরের জন্মগৃহের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। একদিন মাতা ভগবতী দেবী শিশুকে নিয়ে রথোপরি আরোহন করলেন এবং তাকে শ্রীজগন্নাথের শ্রীপাদপদ্মমূলে ছেলে দিলেন। শ্রীজগন্নাথদেব যেন শিশুর কত কালের পরিচিত। আনন্দভরে শিশুটি জগন্নাথকে জড়িয়ে ধরল। ঠিক সে সময় শ্রীজগন্নাথদেবের কণ্ঠ থেকে একটি ফুলের মালা ছিন্ন হয়ে শিশুটির মাথায় এসে পড়লো। তা দেখে পূজারী পাণ্ডাগণ আনন্দে হরি হরি ধ্বনি করে উঠলেন। বললেন-মা, তোমার এ শিশু কালক্রমে মহাপুরুষে পরিণত হবে। শ্রীজগন্নাথদেব একে আশীর্বাদী মালা দিয়েছেন। এ শিশুটিই জগন্নাথের কথা জগতে প্রচার করবে। ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ শুনে মা আনন্দে অশ্রুসিক্ত নয়নে শিশুকে কোলে নিলেন এবং বারবার ব্রাহ্মণ এবং শ্রীজগন্নাথদেবকে বন্দনা করতে লাগলেন। আবির্ভাবের পর শিশুটি তাঁর মায়ের সাথে ছয় মাস পুরীতে থাকার পর পালকিতে চড়ে স্থল পথে রানাঘাটে উপনীত হয়।
১৮৮১ সালে কলকাতার রামবাগানে ভক্তি ভবনের ভিত্তি খননকালে শ্রীকূর্মদেবের একটি বিগ্রহ প্রকট হয়। সাত বছর বয়সে শ্রীসরস্বতী ঠাকুরকে শ্রীভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় শ্রীনাম ও মন্ত্র দিয়ে সেই কূর্মদেবের সেবা করার নির্দেশ দিলেন।
প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। তিনি লাইব্রেরিতে বসে বিভিন্ন দর্শন গ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন। ১৮৯৮ সালে সারস্বত চতুষ্পাঠীতে পড়াশোনা করার সময় পৃথকভাবে ভক্তিভবনে পণ্ডিত পৃথ্বীধর শর্মার নিকট সিদ্ধান্ত কৌমুদী অধ্যয়ন করেন। অল্প কালের মধ্যে তিনি সিদ্ধান্ত কৌমুদীতে বিশেষ জ্ঞান লাভ করেন। ১৮৯৭ সালে তিনি ভক্তিভবনে স্বতন্ত্র একটি সারস্বত চতুষ্পাঠী স্থাপন করেন।
১৮৯৮ সালের অক্টোবরে তিনি ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের সঙ্গে কাশী প্রয়াগ ও গয়া প্রভৃতি তীর্থস্থান ভ্রমন করেন। কাশীতে শ্রীরামমিশ্র শ্রাস্ত্রীর সাথে রামানুজ সম্প্রদায় সম্বন্ধে নানা আলাপ-আলোচনা হয়। তখন থেকে তাঁর অদ্ভুত বৈরাগ্যময় জীবন বিকশিত হতে থাকে। তিনি মনে মনে সদ্গুরুর সন্ধান করতে লাগলেন। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরে তাঁকে সিদ্ধবাবা শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজী মহারাজের শ্রীপাদপদ্ম আশ্রয় করার নিদের্শ দিলেন। পিতার নির্দেশানুসারে তিনি শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজির নিকট দীক্ষ প্রার্থনা করেন।
১৯১৮ সাল থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে প্রভৃতি স্থানে ৬৪টি গৌড়ীয় মঠ স্থাপন করেন। তিনি জগতে বৈকুণ্ঠবানী প্রচারের জন্য বহু শুদ্ধভক্তিময় পত্রিকা প্রকাশ করেন। যেমন- সজ্জনতোষণী পাক্ষিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক গৌড়ীয় পত্রিকা, হিন্দি পাক্ষিক ভাগবত নামক পত্রিকা, দৈনিক নদীয়া প্রকাশ, আসামি ভাষায় মাসিক কীর্তন নামক পত্রিকা, উড়িষ্যা ভাষায় পরমার্থী পত্রিকা। এছাড়াও বহু বৈষ্ণব গ্রন্থও প্রকাশ করেন।
নিত্যলীলায় প্রবেশ করার কিছুদিন পূর্বে তিনি প্রধান শিষ্যগণকে সমবেত করে তাঁদের অনেক আশির্বাদ প্রদান করে ৪ নারায়ণ গৌরাব্দ ৪৫০, ১৭ই পৌষ বঙ্গাব্দ ১৩৪৩, ১ জানুয়ারি ১৯৩৭ সালের শুক্রবার নিশান্তকালে শ্রীশ্রীরাধাগোবিন্দের নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন।
No Comment! Be the first one.