শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী ১৯৪৯ সালের ৯ এপ্রিল, রাম নবমীর পরবর্তী শুক্লপক্ষীয় কামদা একাদশী তিথিতে উত্তর আমেরিকার ইউসকনসিন প্রদেশের মিলওয়েকি অঞ্চলে এক শিক্ষানবিস যাজকের পুত্ররূপে এবং বিরাট রঙের কারখানার কোটিপতি মালিকের পৌত্ররূপে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিগত লীলার অন্তরঙ্গ এক ভক্তের পুনরাবির্ভাব হয় এর্ডম্যান পরিবারে। নাম ছিল জন গর্ডন। পিতার নাম- মিঃ জনহুবার্ট এবং মাতার নাম- লরেইন এর্ডম্যান।
জনের পিতা ছিলেন ধর্মযাজক। বাল্যকাল থেকেই তিনি অসাধারণ মেধাবী এবং আধ্যাত্মিক চেতনা সম্পন্ন ছিলেন। তাঁর বয়স যখন এগার বৎসর তখন তাঁর পিতামহের উপদেশে ভগবানের নাম জপ করার মাধ্যমে তাঁর এক কঠিন চর্মরোগের নিরাময় হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব সহকারে স্নাতক উপাধি লাভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও তিনি একজন যথার্থ সদ্গুরু লাভের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে আসতে মনস্থ করেছিলেন। ১৯৬৮ সালে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের কয়েকজন শিষ্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করে সানফ্রান্সিসকোতে রথযাত্র উৎসবে যোগ দেন এবং সেই দিনেই তিনি তার মস্তক মুন্ডন করে অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধা সহকারে সারাপথ জগন্নাথদেবের রথের দড়ি টেনে সমস্ত ভক্তদের বিস্ময়াম্বিত করেছিলেন।
আর একটি আশ্চার্য্যের বিষয় হল পরের দিন সকালে তিনি সানফ্রানসিসকো থেকে অদৃশ্য হয়েছিলেন। কোথায় গেলেন তিনি, কেউ জানল না। কোনক্রমে তিনি জেনেছিলেন যে, শ্রীল প্রভুপাদ কানাডার মন্ট্রিলে রয়েছেন এবং তিনি তৎক্ষণাৎ মন্ট্রিলের বিমানে চেপে শ্রীল প্রভুপাদের দর্শনে চলে যান এবং সেখানে পৌঁছানো মাত্রই প্রভুপাদ তাকে বসতে দেন এবং তার সাথে প্রসাদ সেবনে বসেন। শ্রীল প্রভুপাদের চরণাশ্রয় লাভ করে জয়পতাকা দাস নামে অভিষিক্ত হয়ে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেবায় জীবন উৎসর্গ করেন।
শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশে শ্রীধাম মায়াপুরের সেবা ভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৭০ সালের রাধাষ্টমী তিথিতে সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করে জয়পতাকা স্বামী অক্লান্তভাবে ভারত ও পশ্চিমী দুনিয়ায় কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের প্রচার চালাতে থাকেন। ১৯৭৭ সালে শ্রীল প্রভুপাদ তার কয়েকজন উর্ধ্বতন শিষ্যের সাথে সম মর্যাদায় ভূষিত করে তাকে দীক্ষা কার্যের দায়িত্ব দেন। ১৯৭৮ সালের প্রবল বন্যায় ভারতের গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে তিনি এক সুপরিচিত ব্যক্তি এবং শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন। ফলে ভারত সরকার তাঁকে ভারতের নাগরিকত্ব প্রদান করেন। তিনি অত্যন্ত গভীর নিষ্ঠা এবং শ্রদ্ধা সহকারে শ্রীল প্রভুপাদের এবং পূর্বতন আচার্যবর্গের মনোভীষ্ট পূরণার্থে নিজের জীবন বিপন্ন করেও বদ্ধ জীবেদের কল্যাণার্থে নিরলসভাবে সারাবিশ্বব্যাপী হরিনাম প্রচারের মাধ্যমে কৃষ্ণ সেবায় নিযুক্ত হয়ে আছেন।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজের আর একটি উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হচ্ছে শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভুর প্রতিষ্ঠিত ও প্রচারিত এবং শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর কর্তৃক পুনঃ প্রচারিত নামহট্ট সংঘের পুনরুজ্জীবন। তাঁরই প্রচেষ্ঠায় আজ ভারতবর্ষে ও পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় সুন্দর মন্দির নির্মিত হয়েছে ও হচ্ছে। বর্তমানে সারা পৃথিবী জুড়ে তার অগণিত শিষ্য রয়েছে।
শ্রী জয়পতাকা স্বামী মহারাজের “বৈষ্ণব কে?” গ্রন্থটির যে মাধুর্যমন্ডিত ভাষ্য প্রদান করেছেন সমগ্র বৈষ্ণব সমাজর কাছে তা এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর শত সহস্র কীর্তিসমূহের দ্বারা তিনি আজ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে শ্রীল প্রভুপাদের একজন যশস্বী শিষ্যরূপে, আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃতের একটি দৃঢ় স্তম্ভরূপে এবং এক অন্যতম মহান আচার্যরূপে তাঁর বিজয়ের নিশান আন্দোলিত হচ্ছে।
নমঃ ওঁ বিষ্ণুপাদায় কৃষ্ণপ্রেষ্ঠায় ভূতলে।
শ্রীমতে জয়পতাকা স্বামীনিতি নামিনে।।
নমঃ আচার্যপাদায় নিতাই কৃপা প্রদায়িনে।
গৌরকথা ধামদায় নগরগ্রাম তারিণে।।
No Comment! Be the first one.