আদিশূর কর্তৃক আহূত হয়ে শ্রীপুরুষোত্তম বঙ্গদেশে শভাগমন করেছিলেন। শ্রীপুরুষোত্তমের বংশে সপ্তম ও অষ্টম অধস্তনরূপে শ্রীবিনায়ক এবং তাঁর পুত্র শ্রীনারায়ণ রাজমন্ত্রী হয়েছিলেন। এ বংশে পঞ্চদশ পর্যায়ে রাজা কৃষ্ণানন্দ দত্তের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন কৃষ্ণভক্ত। শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু তার গৃহে সপার্ষদে শুভপদার্পণ করে তাঁকে অনেক আর্শীবাদ করেছিলেন। তাঁরই বংশে পরবর্তীকালে জন্মগ্রহণ করেন মহাত্মা শ্রীগোবিন্দশরণ দত্ত, যিনি গোবিন্দপুর গ্রামের পত্তন করেছিলেন। কালীঘাট, সুতানুটী ও গোবিন্দপুর- এই তিন গ্রাম নিয়ে কলকাতা শহরের উদ্ভব হয়। গোবিন্দ-শরণের পৌত্র শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীরামচন্দ্রের পৌত্র শ্রীমদনমোহন দত্ত। তিনি কলকাতার হেদুয়া পুস্করিণী জনসাধারণের ব্যবেহারের জন্য মিউনিসিপ্যালিটিকে দান করেছিলেন, গয়ার প্রেতশিলাতীর্থে ও চন্দ্রনাথের পাহাড়ে বিপুল অর্থ-ব্যয়ে সিঁড়ি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। তাঁর পৌত্র শ্রীরাজবল্লব দত্ত। শ্রীরাজবল্লভের পুত্র পরমধার্মিক শ্রীআনন্দ চন্দ্র দত্ত। নদীয় জেলার উলা গ্রামের প্রসিদ্ধ জমিদার শ্রীঈশ্বর চন্দ্র মুস্তৌফীর কন্যা শ্রীজগন্মোহিনীদেবীর সঙ্গে শ্রীআনন্দচন্দ্রের বিবাহ হয়।
শ্রীআনন্দ চন্দ্র দত্ত ও শ্রীজগন্মোহিনীদেবীর পিতামাতারূপে অঙ্গীকার করে ৩৫২ গৌরাব্দ, ১২৪৫ বঙ্গাব্দ ১৮ ভাদ্র, ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে ২ সেপ্টেম্বর রবিবার শ্রক্লা-ত্রয়োদশী ও শুভবাসরে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর উলাগ্রামে (বীরনগরে) তার মাতামহের আলয়ে আর্বিভূত হলেন। পিতামাতা তার নাম রাখলেন-শ্রীকেদারনাথ।
শিশুকালে মাত্র দুবছর বয়সে ঠাকুরের জিহ্বায় কবিত্বের স্ফূতি হয়। পরবর্তীতে তাঁর রচিত বিভিন্ন অপ্রাকৃত গীতসমূহের দ্বারা এ কবিত্বের বিকাশ হয়। তিনি নয় বছর বয়সে জ্যোতিষশাস্ত্র সম্বন্ধে গবেষণা আরম্ভ করেন। ঠাকুর তাঁর আত্মচরিতে লিখেছেন- দশর বছর বয়সে তাঁর চিত্তে তত্ব-জিজ্ঞাসার উদয় হয়। তিনি তত্ত্বজ্ঞানে সর্বদা উদ্ভাসিত থাকলেও মনুষ্য জন্মের বৈশিষ্ট্য-খ্যাপনের জন্য উক্ত লীলার প্রাকট্য সাধন করেন।
ঠাকুর ছয় বছর বয়সে বিদ্যাবাচস্পতির টোলে গিয়ে সংস্কৃত পাঠ শ্রবণ করতেন। শ্রীঈশ্বরচন্দ্র মুস্তৌফী মহাশয় ঠাকুরকে সাত বছর বয়সে কৃষ্ণষগর কলেজে শিক্ষার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। পরে উলাতে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় সংস্থাপিত হলে ঠাকুর তাতে ৮ বছর বয়সে ভর্তি হলেন।
এগারো বছর বয়সে ঠাকুরের পিতৃবিয়োগ হয়। তৎকালীন বঙ্গদেশের সামাজিক প্রথা অনুযায়ী শ্রীকেদারনাথের জননী বারো বছর বয়স্ক বালককে রানাঘাটনিবাসী পাঁচ বছরের এক বালিকার সঙ্গে বিবাহ সম্পাদন করলেন।
শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহোদয়ের ইচ্ছাক্রমে ঠাকুর কটক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা এবং ভদ্রক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকতার পদ স্বীকার করেছিলেন। সে সময় ঠাকুরের রচিত উড়িষ্যার মঠসমূহের তথ্যপূর্ণ একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। ৪০০ গৌরাব্দে শ্রীগৌড়ীয় গোস্বামী সংঘ কর্তৃক ঠাকুর “ভক্তিবিনোদ” নামে ভূষিত হন। তখন থেকেই শ্রীকেদারনাথ “শ্রীসচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর” নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
পুরীর আঢ্য পরিবার গ্রান্ড রোডের দক্ষিণপাশে মঠের জমি ইজারা নিয়ে গৃহ নির্মাণ করেছিলেন। সেই গৃহে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর অবস্থান করতেন। স্থানটি শ্রীজগন্নাথ মন্দেরের নিকটস্থ নারায়ণ-ছাতা সংলগ্ন। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের (১৭৯৫ শকাব্দে, ১২৮০ বঙ্গাব্দ) ২৫ মাঘ, ৬ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার মাঘী কৃষ্ণাপঞ্চমী তিথিতে বিকাল সাড়ে তিনটার পর ঠাকুরের হরিকীর্তন মুখরিত বাসভবনে শ্রীভগবতীদেবীর কোলে এক জ্যোতির্ময় দিব্যকান্তি শিশুর আবির্ভাব হয়। শ্রীজগন্নাথদেবের পরাশক্তি শ্রীবিমলাদেবীর নামানুসারে ঠাকুর শিশুর নামকরণ করেন শ্রীবিমলাপ্রসাদ।
১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে শ্রীশ্রীরাধাগোন্দিদের গূঢ়প্রেমরস আস্বাদনে সর্বক্ষণ নিবিষ্ট থাকার জন্য ঠাকুর শ্রীভাগবত পরমহংসবেশ গ্রহণ করেছিলেন।
১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ২৩ জুন, ১৩২১ সনের আষাঢ় শ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর কলকাতায় ভক্তিভবনে গৌরশক্তি শ্রীগদাধর পণ্ডিত গোস্বিামীর অপ্রকটতিথিবাসরে শ্রীরাধাকুণ্ডের মাধ্যাহ্নিক লীলায় প্রবিষ্ট হলেন। ঠাকুরের অপ্রকটের ছয় বছর পর পরমপূজনীয়া মাতা ঠাকুরাণী শ্রীভগবতী দেবী ভক্তিভবনে অন্তর্ধানলীলা প্রকট করলেন।
No Comment! Be the first one.