ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ লীলা নিজেই বলেছেন যে, তাঁর জন্ম ও কর্ম সবই দিব্য এবং কেউ যখন তত্ত্বগতভাবে তা জানতে পারেন, তখন তিনি ভগবদ্ধামে প্রবেশ করার যোগ্যতা অর্জন করেন। ভগবানের জন্ম কোন সাধারণ মানুষের মত নয়। সাধারণ মানুষের জন্ম হয় কর্মফলের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। কর্মের ফলস্বরূপ সে এক দেহ থেকে অন্য দেহে দেহান্তরিত হয়। ভগবানের জন্মের কথা বিশ্লেষণ করে ভগবদগীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, তিনি তাঁর নিজের ইচ্ছায় আবির্ভূত হন।
যখন শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের সময় হলো, তখন কাল সর্বগুণ সমন্বিত হয়ে পরম সুন্দর হয়ে উঠল এবং পৃথিবীও আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। তিথি, যোগ এবং নক্ষত্র তখন সর্বমঙ্গলময় এবং সর্বসুলক্ষণ যুক্ত হয়ে উঠল এবং সর্বসুলক্ষণযুক্তা রোহিনী নক্ষত্র তখন তু্ঙ্গে প্রকাশিত হলো। ব্রহ্মা স্বয়ং এ রোহিনী নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেন। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে, নক্ষত্রের অবস্থান ছাড়াও বিভিন্ন গ্রহের অবস্থান ও প্রভাবের ফলে শুভ এবং অশুভ তিথি ও যোগ বিচার করা হয়। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবকালে সমস্ত গ্রহ মঙ্গলময় অবস্থা ও শুভ ইঙ্গিত প্রদর্শন করে বিরাজ করতে লাগল।
তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাতের গভীর অন্ধকারে চতুর্ভুজ বিষ্ণুরূপ ধারণ করে দেবকী-বাসুদেবের সম্মুখে আবির্ভূত হলেন। পূর্ণচন্দ্র যেভাবে উদিত হয়, ঠিক সেভাবেই পরমেশ্বর ভগবান আবির্ভূত হলেন। কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল অষ্টমী তিথিতে, তাহলে পূর্ণচন্দ্রের উদয় হলো কী করে? এর উত্তরে বলা হয়েছে যে, শ্রীকৃষ্ণ চন্দ্রবংশে আবির্ভূূত হয়েছিলেন, তাই চন্দ্র সেই রাতে অপূর্ণ থাকলেও সেই বংশে ভগবানের আবির্ভাবের ফলে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে সেদিন পূর্ণ হয়ে উঠলেন।
বাসুদেব দেখলেন যে, সেই অদ্ভুত শিশুটি চতুর্ভুজ। তিনি তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম ধারণ করে আছেন। বক্ষে তাঁর শ্রীবৎস চিহ্ন, কণ্ঠে কৌস্তুত শোভিত কণ্ঠহার, পরনে পীতবসন, উজ্জ্বল মেঘের মতো তাঁর গায়ের বর্ণ, বৈদুর্য মণিভুষিত কিরীট তাঁর মস্তকে শোভা পাচ্ছে, নানারকম মহামূল্যবান মনি-রত্ন শোভিত সমস্ত অলঙ্কার তাঁর দিব্য দেহে শোভা পাচ্ছে, নানরকম মহামূল্যবান মনি-রত্ন শোভিত সমস্ত অলঙ্কার তাঁর দিব্য দেহে শোভা পাচ্ছে, তাঁর মাথা ভর্তি কুঞ্চিত কালো কেশরাশি। এই অদ্ভুত শিশুটিকে দেখে বাসুদেব অত্যন্ত আশ্চার্য হলেন। তিনি ভাবলেন কীভাবে একটি নবজাত শিশু এ রকম সমস্ত অলঙ্কারে ভূষিত হলো? তাই তিনি বুঝতে পারলেন যে, শ্রীকৃষ্ণই তাঁর পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি তখন অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। বাসুদেব তখন ভাবতে লাগলেন, যদিও তিনি একজন সাধারণ মানুষ এবং বাহ্যিক দিক থেকে কংসের কারাগারে আবদ্ধ, তবুও পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু তাঁর স্বরূপ ধারণ করে তাঁর সন্তানরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। কোনো মনুষ্যশিশু এভাবে চতুর্ভুজ রূপ নিয়ে অলঙ্কার এবং সবরকম বিদ্য সাজে সজ্জিত হয়ে পরমেশ্বর ভগবানের সমস্ত লক্ষণযুক্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে না।
বসুদেব বারবার সেই শিশু সন্তানটির দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন এবং ভাবতে লাগলেন কীভাবে তাঁর এরকম সৌভাগ্যের মুহূর্তটি তিনি উদযাপন করবেন। তিনি ভাবলেন, “সাধারণত যখন পুত্রসন্তানের জন্ম হয়, মানুষ তখন মহোৎসব করে, আর পরমেশ্বর ভগবান আজ আমার সন্তানরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। কত মহা আড়ম্বরেই না এ উৎসব পালন করা উচিত।”
বাসুদেবের মনে আর যখন সংশয় রইল না যে, এ নবজাত শিশুটিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তখন তিনি করজোড়ে প্রণিপাত করে তাঁর বন্দনা করতে শুরু করলেন। বাসুদেব তখন চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে কংসের ভয় থেকে মুক্ত হলেন। শিশুটির অঙ্গকান্তিতে সেই ঘর উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
বাসুদেব তখন প্রার্থনা করতে লাগলেন “হে প্রভু, আমি জানি আপনিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, সমস্ত জীবের পরমাত্মা এবং পরম সত্য। আপনি আপনার নিত্য স্বরূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন, যা আমি এখন সরাসরি দর্শন করতে পারছি। আমি বুঝতে পারছি যে, যেহেতু আমি কংসের ভয়ে ভীত, তাই সে ভয় থেকে আমাকে উদ্ধার করার জন্য আপনি আবির্ভূত হয়েছেন। আপনি এই প্রকৃতির অতীত, আপনিই সেই পরম পুরুষ, যিনি মায়ার প্রতি দৃষ্টিপাত করে এ জড় জগৎ প্রকাশিত করেন। হে প্রভু, পরম নিয়ন্তা হওয়া সত্ত্বেও আপনি কৃপা করে আমার পুত্ররূপে অবতরণ করেছেন। হে প্রভু, পরম নিয়ন্তা হওয়া সত্ত্বেও আপনি কৃপা করে আমার পুত্ররূপে অবতরণ করেছেন। বর্বর কংস ও তার দুরাচারী সঙ্গীরা, যারা রাজবেশ ধারণ করে পৃথিবীর উপর রাজত্ব করছে, সে সমস্ত অসুর ও তাদের অনুচরদের সংহার করার জন্যই আপনি অবতরণ করেছেন। আপনি যে তাদের সংহার করবেন, সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সে কথা জানতে পেরে কংস আপনার পূর্বজাত ভাইদের হত্যা করেছে। এখন সে কেবল আপনার জন্ম-সংবাদের প্রতীক্ষা করছে। সংবাদ পাওয়া মাত্রই সে আপনাকে হত্যা করার জন্য এখানে সশস্ত্র উপস্থিত হবে।”
তারপর মাতা দেবকীও পরমেশ্বরের নিকট প্রার্থনা করেন। দেবকীর প্রর্থনা শুনে ভগবান বললেন, “হে মাতা, স্বায়ম্ভুব মনুর সময় আমার পিতা বাসুদেব সুতপা নামে একজন প্রজাপত ছিলেন আর আপনি ছিলেন তাঁর পত্নী। আপনার নাম ছিল পৃশ্নি। সে সময় ব্রহ্ম প্রজা বৃদ্ধি করার আকাঙ্ক্ষায় আপনাদের সন্তান উৎপাদন করতে অনুরোধ করেন। তখন আপনারা আপনাদের ইন্দ্রিয় সংযম করে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। প্রাণায়াম করে আপনি এবং আপনার পতি জড়া প্রকৃতির সমস্ত নিয়মগুলো সহ্য করেছিলেন- বর্ষার বর্ষণ, গ্রীষ্মের তাপ, ঝড়-ঝঞ্ঝা সব আপনারা সহ্য করেছিলেন, হৃদয় নির্মল করেছিলেন এবং জড়া প্রকৃতির সমস্ত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। তপশ্চর্যা পালন করে নির্মল করেছিলেন এবং জড়া প্রকৃতির সমস্ত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। তপশ্চর্যা পালনে করে আপনারা কেবল গাছের ঝরা পাতা আহার করে জীবন ধারণ করেছিলেন, তারপর আপনারা ইন্দ্রিয়নিগ্রহ করে একাগ্রচিত্তে আমার আরাধনা করে আমার কাছ থেকে কোন অদ্ভুত বর প্রার্থনা করেছিলেন।
আপনারা দেবতাদের গণনা অনুসারে ১২,০০০ বছর ধরে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তখন আপনাদের চিত্ত কেবল আমাতেই সমাহিত ছিল। আপনারা যখন ভক্তিযোগ অনুষ্ঠান করেছিলেন এবং আপনাদের হৃদয় সর্বক্ষণ আমারই ধ্যান করেছিলেন, তখন আপমি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে আপনাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য এ রূপ নিয়েই আবির্ভূত হয়েছিলাম। আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি কী কামনা করেন?’ আপনি বলেছিলেন, আমি যেন আপনার পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করি। যদিও আপনি তখন আমাকে সাক্ষাৎ দর্শন করেছিলেন, তবুও আমার মায়ার প্রভাব থেকে মুক্তি প্রার্থনা না করে আপনি কেবল আমাকে আপনার পুত্ররূপে কামনা করেছিলেন।”
এভাবে তাঁর পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বলে ভগবান নিজেকে একটি ছোট্ট শিশুতে পরিণত করলেন।
শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা অদিষ্ট হয়ে বসুদেব সূতিকাগার থেকে তাঁর সন্তানটিকে গোকুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। সে সময় গোকুলে নন্দ এবং যশোদর একটি কন্যা জন্মগহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তি যোগমায়া। যোগমায়ার প্রভাবে কংসের প্রাসাদের প্রতিটি বাসিন্দা বিশেষ করে প্রহরীরা মোহচ্ছন্ন হয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন হলো এবং কারাগারের সবকটি দরজা আপনা থেকেই খুলে গেল, যদিও সেগুলো খিল দেওয়া ছিল এবং লোহার শিকল দিয়ে বাঁধা ছিল। সেই রাতটি ছিল ঘোর অন্দকারময়। কিন্তু যখনই বাসুদেব তাঁর শিশুসন্তানটিকে কোলে নিয়ে বাইরে এলেন, রাত্রির অন্দকার বিদূরিত হয়ে গেল এবং তিনি সবকিছু দিনের আলোর মতো দেখতে পেলেন।
ঠিক সে সময় গভীর বজ্রনিনাদের সঙ্গে প্রবল বর্ষণ হতে শুরু করল। বসুদেব যখন তাঁর শিশুসন্তান শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে সেই বৃষ্টির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ভগবান অনন্তদেব সর্পরপ ধারণ করে সেই বর্ষণ থেকে বসুদবেকে রক্ষা করার জন্য বসুদেবের মাথার উপর তাঁর ফণা বিস্তার করলেন। বসুদেব যমুনার তীরে এসে দেখলেন যে, যমুনার জল প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে প্রবাহিত হচ্ছে, তার বিশাল তরঙ্গগুলো ফেনিলোচ্ছল হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ ভয়ঙ্কর রূপ সত্ত্বেও বসুদেবকে যাওয়ার পথ করে দিলেন, ঠিক যেমন ভারত মহাসাগর রামচন্দ্রের সেতু বন্দনের সময় তাঁর জন্য পথ করে দিয়েছিলেন। এভাবে বসুদেব যমুনা পার হয়ে অপর পাড়ে গোকুলে নন্দ মহারাজের গৃহে উপস্থিত হলেন। সেখানে তিনি দেখলেন যে, সমস্ত গোপ-গোপী গভীর নিদ্রায় মগ্ন। সেই সুযোগে তিনি নিঃশব্দে যশোদা মায়ের গৃহে প্রবেশ করে তাঁর পুত্রসন্তানটিকে সেখানে রেখে যশোদার সদ্যোজাত কন্যাকে নিয়ে কংসের কারাগারে ফিরে এলেন এবং দেবকীর কোলে কন্যাটিকে রাখলেন। তিনি নিজেকে আবার শৃঙ্খলাবদ্ধ করলেন যাতে কংস বুঝতে না পারে। এভাবে পরমেশ্বর ভগবান তাঁর দিব্য জন্ম লীলা প্রকাশ করেন।
No Comment! Be the first one.