(দক্ষযজ্ঞে সতী দেহত্যাগ করলে মহাদেব মৃতদেহ স্কন্ধে নিয়ে উন্মত্তব নৃত্য করতে থাকেন। বিষ্ণু সেই দেহ চক্র দ্বারা ছেদন করেন। তাহা যে যে স্থানে পতিত হয়, সেই সেই স্থানকে পীঠস্থান বলে। )
“মাতঃ পরা পরে দেবী সর্বজ্ঞান মহীশ্বরী।
কথ্যতাং মে সর্বপীঠ শক্তি ভৈরব দেবতাঃ।
হে একপঞ্চাশে পীঠেশ্বরী! জগজ্জননী! তুমি সর্বজ্ঞানময়ী। হে জগদীশ্বরী তুমি আমাকে সমস্ত পীঠ ও তাঁহাদের অধিষ্ঠাত্রী শক্তি ও অধিষ্ঠিত ভৈরবের নাম বল।
১) হিঙ্গুলায়
সতীর “ব্রহ্মরন্ধ”। এখানে দেবী কোটারী ও অধিষ্ঠিত দেবভৈরব ভীমলোচন। ইহার আধুনিক নাম হিংলাজ, ইহা বেলুচিস্থানের দক্ষিণ ভাগে হিঙ্গুলা নদীর তীরে অবস্থিত। মুসলমান সাধক ও সফীদের নিকট “দেবী নানী বিবি” নামে খ্যাত। করাচী হইতে ৯০ মাইল উত্তরে অবস্থিত ইহাই হিন্দুদের পশ্চিম সীমান্তের শেষ তীর্থক্ষেত্র। কলিকাতা হইতে দিল্লী হয়ে ১৮০ মাইল। অথবা সাহারাণপুর হয়ে ১৮০৯ মাইল। হিংলাজে বাঙ্গালী ব্রহ্মানন্দ ও তাহার শিষ্য জ্ঞানানন্দ তান্ত্রিক দর্শন ও সাধনা প্রচার করেন।
২) কবরীপুর
সতীর “তিনচক্ষু”। দেবী মহিষমর্দ্দিনী ভৈরব ক্রোধীশ। ইহার আধুনিক নাম শঙ্কর নগর। সিন্ধু প্রদেশে অবস্থিত। কলিকাতা হইতে দিল্লী ও ভাতিন্ডা হয়ে ১৫১৭ মাইল অথবা সাহারাণপুর ও ভাতিন্ডা হয়ে ১৫৪৪ মাইল। শক্কর জেলার রেল ষ্টেশনের নিকটবর্তী তীর্থ বিরাজমান।
৩) সুগন্ধায়
সতীর “নাসিকা”। দেবী সুনন্দা, ভৈরব ত্র্যম্বক। পুরাকালে এই স্থানের পার্শ্ব দিয়ে সুগন্ধা নদী প্রবাহিত ছিল এবং সুনন্দা উগ্রতারা নামেও অভিহিতা ছিলেন। আধুনিক নাম সিকারপুর। সুগন্ধা গঙ্গার শাখানদীর তীরে। বরিশাল হতে ১৩ মাইল উত্তরে সিকারপুর গ্রামে সুগন্ধা বা উগ্রতারা দেবীর মন্দির। এই স্থানে শিবচতুর্দশীতে বিরাট মেলা বসে এবং দূর্গাপূজা ও লক্ষ্মী পূর্ণিমা হতে শ্যামাপূজা পর্যন্ত শারদীয়া উৎসবে ও দোল পূর্নিমার উৎসবে বহু যাত্রী সমাগত হয়। কলিকাতা হতে খুলনা পর্যন্ত রেলে পরে বরিশাল পর্যন্ত ষ্টিমারে যেতে হবে। বরিশাল হতে পদব্রজে, নৌকায় বা মটর লঞ্চেও যাওয়া যায়। ভৈরব ত্র্যম্বকেশ্বরের মন্দির ঝালকাঠি ষ্টেশন হতে ৩ মাইল দক্ষিণে পোনাবালিয়া সামরাইল গ্রামে সুগন্ধা বা সুন্ধা নদীর তীরে অবস্থিত। শিবচতুর্দশী উপলক্ষে মেলা হয়।
৪) অমরনাথ
কাশ্মীরে সতীর ‘কণ্ঠ’। মহামায়া দেব ত্রিসন্ধ্যেশ্বর ভৈরব। কাশ্মীরের শ্রীনগর হতে ১৫ মাইল উত্তরে ক্ষীরভাবানীর মন্দির একটি ক্ষুদ্র দ্বীপের কুণ্ড মধ্যে অবস্থিত। কুণ্ডের জল কখনও লাল, কখনও সবুজ বা নীল বর্ণে বৈচিত্র্যরূপ ধারণ করে। কুণ্ডের মধ্যস্থলে শ্বেত মর্মরের ছোট মন্দির উর্দ্ধদেশে চূড়া লয়ে জলের ভিতর হতে উঠেছে। ভিতরে শ্বেতবর্ণ প্রস্তারের শিবলিঙ্গ ও তাহার পার্শ্বে করপ্রস্তরের ভবানী মূতি। প্রতি মাসের শুক্লা মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে মেলা ও তীর্থযাত্রীর সমাগম হয়। ১৮১৮ খ্রিষ্ট্রাব্দে কাশ্মীরের অমরনাথ তীর্থের স্বামী বিবেকানন্দ ক্ষীর ভবানীর পবিত্র প্রস্রবনের তটে উগ্র তপস্যায় মহামায়া ভবানীর দিব্যদর্শন ঘটে।
৫) জ্বালামুখী
সতীর ‘জিহ্বা’। অম্বিকা দেবী ভৈরব “উন্মত্ত”। জ্বালামুখী মহাপীঠ পাঞ্জাব প্রদেশের কাংড়া জেলাতে অবস্থিত। অম্বিকার মন্দিরে একটি স্বতঃপ্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখাকেই শক্তিরূপে অর্চনা করা হয়। ঐ শিখাই সেখানে দেবীর বিগ্রহ। এই স্থানে শারদীয় ও বাসন্তী নব রাত্রে খুব বড় মেলা হয়। কলিকাতা হতে সাহারাণপুর ও জলন্ধর জংশন হয়ে হোসিয়ারপুর ষ্টেশনে যেতে হয়। তথা হতে তীর্থস্থানে যাওয়ার জন্য ডুলি ও টোংগা পাওয়া যায়। হাওড়া হতে আম্বালা দিয়ে ১১২২ মাইল।
৬) জলন্ধরে
সতীর ‘বাম স্তন’। দেবী ত্রিপুরা মালিনী ভৈরব “ভীষণ” তীর্থ স্তনপীঠ নামে খ্যাত। এখানে কালী, তারা ও ত্রিপুরা এবং ব্রজেশ্বরী দেবী বিরাজমান। জ্বালামুখীর নিকট বিপাশা নদীর তীরে নাদাউন তীর্থ অবস্থিত।
৭) বৈদ্যনাথ
সতীর ‘হৃদয়’। দেবী জয়দূর্গা ভৈরব “বৈদ্যনাথ”। বৈদ্যনাথ বিহারের সাওতাল পরগণায় অবস্থিত। শিবগঙ্গাতে স্নান করে পূজা করা হয়। সুপ্রসিদ্ধ দ্বাদশ জ্যোতিলিঙ্গের মধ্যে বৈদ্যনাথের শিবলিঙ্গ অন্যতম। কলিকাতা হতে ২৫০ মাইল।
৮) নেপাল
সতীর ‘জানুদ্বয়’। দেবী মহামায়া ভৈরব “কপালী ভৈরব”। পশুপতিনাথ মন্দিরের নিকট মহাপীঠস্থান। পিঠাধিষ্ঠাত্রী মহামায়া নবদূর্গা নামেও অভিহিত হয়ে থাকেন। পশুপতিনাথে গুহ্যেশ্বরী দেবী বিরাজমান। মোকামঘাট ষ্টেশনে নেমে গঙ্গা পার হয়ে বি.এন.ডব্লউ. রেলে ৪৫৩ মাইল, রাক্সোলী ষ্টেশন হতে নেপাল যেতে হয়।
৯) মানস সরোবর
সতীর ‘দক্ষিণ হস্ত’। দেবী “দাক্ষায়ণীঃ ভৈরব অমরনাথ”। মানস সরোবরের তীরস্থিত এক সুবৃহৎ গুহায় “হর-পার্ব্বতীঃ মূর্তি” প্রতিষ্ঠিত। পরিব্রাজকাচার্য্য স্বামী রামানন্দ বলেন, গুহার মধ্যে হস্তলিখিত রাশি রাশি পুস্তক অতি গোপনে সুরক্ষিত। ঐ পুস্তক দর্শন সকলের ভাগ্যে ঘটে না কেবল মাত্র দেবতা দর্শন করে চলে যান।
১০) উৎকল (পুরী)
সতীর ‘নাভিঃ’ পতিত হয়। দেবী বিমলা ভৈরবঃ জগন্নাথ পীঠস্থান বিরজাক্ষেত্র নামে খ্যাত। জগন্নাথের মন্দিরের পশ্চিমে বিমলাদেবীর মন্দির অবস্থিত। দেবী পূর্বাভিমুখিনী হয়ে বিরাজিত। চতুর্ভুজা দক্ষিণ নিম্নহস্তে অক্ষমালা, দক্ষিণ উর্দ্ধ হস্তে অমৃত কলস, বাম উর্দ্ধ হস্তে নাগকন্যা, ডান নিম্নহস্তে অভয় বর। বি,এন,আর যোগে ৩৯০ মাইল।
১১) গণ্ডকী নদী
সতীর ‘দক্ষিণ গণ্ড’। দেবী “গণ্ডকীচণ্ডী” ভৈরব “চক্রপানী”। আধুনিক নাম গণ্ডক নদীর উৎপত্তি স্থল গণ্ডক পর্বত। এই পর্বতের শিলা সংগ্রহক্রমে “শালগ্রাম চক্র” ব্রাহ্মণগণ পূজা করে প্রতি হিন্দুর গৃহে বিষ্ণুর নাম মহিমা প্রচার করছে। এটি নেপাল রাজ্যের অধীন। পীঠাধিষ্ঠাত্রী দেবীর পৃথক বিগ্রহ নাই। পর্বতের শিলা যেখানে পাওয়া যায় সেখানে দেবীজ্ঞানে আজও পূজিতা।
১২) বহুলায়
সতীর ‘বাম বাহু’। দেবী ‘বহুলা’ ভৈরব ‘ভীরুক’। বর্তমানে বর্ধমান জেলারকাটোয়ার নিকটবর্তী কেতু গ্রামে এই মহাপীঠ অবস্থিত। গ্রাম মধ্যে মায়ের মন্দির আছে।
১৩) উজানি
সতীর ‘দক্ষিণ কনুই’। দেবী ‘মঙ্গলচণ্ডী’ ভৈরব ‘কপীলা’র। উজানী মহাপীঠ বর্ধমান জেলার আধুনিক কোগ্রামে অবস্থিত। এখানে মঙ্গলচন্ডী ভক্ত শ্রীমন্ত সদাগরের জন্মস্থান। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্ত্তী ষোড়শ শতাব্দীতে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে মঙ্গলচণ্ডীর মাহাত্ম্য কীর্তন করেছেন। কলিকাতা হতে ৮২ মাইল দূরে অবস্থিত। কারো মতে এখানে সতীর কনুই বা কর্পুর পতিত হয়েছিল। ‘হরসিদ্ধিতে’ মহারাজ বিক্রমাদিত্যের রাজধানী উজ্জয়িনীর আধুনিক নামে উজ্জৈন। পশ্চিম ভারতের গোয়ালিয়র রাজ্যে অবস্থিত। একটি প্রধান শক্তিপীঠরূপে কীর্তিত হয়ে আসছে। এখানকার পীঠাধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম ‘হরসিদ্ধি’ ভৈরব ‘মহাকাল’ তন্ত্রোক্ত বচনে উজ্জয়িনী মহাপীঠে শক্তি ‘মঙ্গলচণ্ড’ ভৈরব ‘কপিলেশ্বর’। উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দির তত্রত্য রুদ্র সাগরের অপর তীরে বিক্রমাদিত্যের আরাধিতা হরসিদ্ধি দেবীর প্রাচীন মন্দির বিদ্যমান। এখানে দেবীর কোন প্রতিমা নেই। শ্রীমন্ত দেবী-প্রতীকরূপে পূজিত হয়ে থাকেন।
১৪) চট্টগ্রাম
সতীর ‘দক্ষিণ হস্তার্দ্ধ’। দেবী ‘ভবানী’ ভৈরব ‘চন্দ্রশেখর’। কলিকাতা হতে সীতাকুণ্ড রেল ষ্টেশনে গোয়ালন্দ ও চাঁদপুর হয়ে ৩৪০ মাইল দূরে অবস্থিত। চন্দ্রনাথ পর্বতে সমতল ভূমি সীতাকুণ্ড রেল ষ্টেশন হতে ১ মাইল দূরে সর্বোচ্ছ শিখরে মহাপীঠাধিষ্ঠাত্রী ভৈরব চন্দ্রশেখর শিবলিঙ্গ বিরাজিত। চন্দ্রনাথ পর্বতে ব্যাসকুণ্ড, সীতাকুণ্ড, জ্যোতির্ময়, সুরুধুনী, ভবানী, স্বয়ম্ভুনাথ, গয়াক্ষেত্র, সরস্বতী শিলা, বিরূপাক্ষ, হরগৌরী, চন্দ্রনাথ, লবণাক্ষ, সহস্র ধারা, বাড়বানল, জ্বালামুখী ইত্যাদি বহু তীর্থ সমাবেশ রয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দিতে ত্রিপুরেশ্বরাজর্ষি গোবিন্দমানিক্য পর্বতচূড়ায় চন্দ্রনাথ দেবের মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছেন। ব্যাসকুণ্ডের অগ্নিকোণে পীঠাধিষ্ঠাত্রী ভবানী দেবীর মন্দির অবস্থিত। তাহার নিকটে স্বয়ম্ভুনাথ শিবলিঙ্গ বা চন্দ্রশেখর ভৈরব। অপর শৃঙ্গে পর্বতের বিরূপাক্ষ শিবলিঙ্গ অবস্থিত। পীঠাধিষ্ঠাত্রী দেবী ভবানী চতুর্ভুজা কালীমূর্তি ও তাহার চতুস্পার্শ্বে কোটিচামুণ্ডা অবস্থান করছেন। সমুদ্র হতে প্রায় ১২০০ শত ফুট উচ্চে এই চন্দ্রনাথ পর্বত শিখরে আরোহণ করে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য মনপ্রাণ হরণ করে। শিবচতুর্দ্দশী ও কার্ত্তিক পূর্ণিমাতে বিরাট মেলা বসে।
১৫) ত্রিপুরা
সতীর ‘দক্ষিণ চরণ’। দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী ভৈরব ‘ত্রিপুরেশ’। ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত উদয়পুর, প্রাচীন রাধাকিশোরপুরে সতীর ডান চরণ পতিত হয়। নগর হতে পূর্ব- দক্ষিণ কোণে ১ মাইল দূরে পর্বতের সানুদেশে মন্দির মধ্যে প্রস্তরময়ী কালিকামূর্তি প্রতিষ্ঠিতা। ১৫০১ খ্রিঃ মহারাজ ধন্যমানিক্য মন্দির নির্মাণ করেন। উদয়পুরের উপকণ্ঠে ত্রিপুরেশ ভৈরবের লিঙ্গ মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। ভৈরব মন্দির জনসাধারণের নিকট মহাদেবের বাড়ী বলে খ্যাত। এই প্রসঙ্গে স্মরনীয় যে ত্রিপুরাসুন্দরী ষোড়শী মহাবিদ্যার নামান্তর এবং তাহার ধ্যান কালিকা হতে স্বতন্ত্র। কলিকাতা, গোয়ালনন্দ, চাঁদপুর পথে কুমিল্লা ২৯৭ মাইল এবং কুমিল্লা হতে উদয়পুর ৩০ মাইল। মটর সার্ভিস পথে মহাপীঠে যাওয়ার রাস্তা। প্রতি পৌষ মাসব্যাপী মেলা হয়।
১৬) ত্রিস্রোতায়
সতীর ‘বামপদ’। দেবী ‘ভ্রামরী’ ঈশ্বর ভৈরব (মতান্তরে) ‘ভৈরব অমর’। আধুনিক নাম উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বোদা এলাকায় তিস্তা নদীর তটে শালবাড়ী গ্রামে এই মহাপীঠ। কলিকতা হতে ৩১৪ মাইল দূরে অবস্থিত।
১৭) কামরূপ কামাখ্যা
সতীর ‘যোনী’। ‘যোনী’ পীঠ মহামুদ্রা পতিত হয়েছে। শক্তি ও ‘কামাখ্যা’ ভৈরব উমানন্দা। শিয়ালদহ ষ্টেশন হতে আমিন গাঁও পথে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ৪৭৬ মাইল দূরে কামাখ্যা রেল ষ্টেশন। এই তীর্থ কোচরাজ বিশ্বসিংহ খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতকের প্রথম ভাগে পুনঃসংস্কার করেন। দেবী কামাখ্যা ত্রিগুণাতীতা হয়েও রক্তপাষাণ রূপিনী মূর্তিতে মন্দিরের গাঢ় অন্ধকারপূর্ণ প্রকোষ্ঠে অবস্থিতা আছে। বিষ্ণুমাধব, ভৈরব উমানন্দসহ দেবী কামাখ্যা বিহার করেন। এই মহােপিঠে জীবের নিঃসন্দেহে মুক্তি লাভ হয়। এই মহাপীঠ গৌহাটি শহরের নিকটে কামগিরি বা নীল পর্বতের চূড়ায় মন্দির মধ্যে দেবী কামাখ্যা প্রতিষ্ঠিত। এটি যোনীপীঠ বা কুব্জিপীঠ নামেও আখ্যাত। এই মহাশক্তি ভৈরবী কামাখ্যায়, প্রচন্ড চণ্ডিকা, ছিন্নমস্তা, মাতঙ্গী, ত্রিপুরা, অম্বিকা, বগলা, কমলা, ভুবনেশ্বরী, ধূমাবতীসহ দশ মহাবিদ্যার মূর্ত্তি রয়েছে। এই দশজন মহাপীঠীধিষ্ঠাত্রী দেবীর দশজন ভৈরব রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যভাগে একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে পীঠাধিষ্ঠাতা ভৈরব উমানন্দ মহাদেবের মন্দির অবস্থিত। এই দ্বীপটি একখণ্ড বৃহৎ পর্বতশৃঙ্গ মাত্র। চতুর্দিকে ব্রহ্মপুত্রের খরস্রোত প্রবাহমান। ভৈরবের মন্দিরটি প্রস্তর নির্মিত প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত। বিগ্রহ পিতলের মূর্তি, পঞ্চমুণ্ড বিশিষ্ট শিবমূর্তি দেখতে বড়ই সুন্দর। অম্বুবাচী ও শারদীয়া দূর্গাপূজা উপলক্ষে কামাখ্যা ধামে সর্বাধিক লোক সমাগত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৯৩ অব্দে বৌদ্ধ প্রণীত হ্বেজ ও সাধনমালা গ্রন্থে কামরূপ মাহাত্ম্য বর্ণনে আন্তর্জাতিক তীর্থের মহাপীঠ নাম আছে, যথা- উডিয়ান, জলন্ধর, পূর্ণগিরী, কামাখ্যা, সিরিহট্ট বা শ্রীহট্ট এতদ্ভিন্ন পুরাণ, তন্ত্র ও বৈদিক যুগের গ্রন্থে মহাপীঠগুলির প্রাচীনত্ব সূচিত হয়েছে। উমানন্দ ভৈরবের পূজা না করে কামাখ্যার মহাপীঠ নিষিদ্ধ বলে জনশ্রুতি আছে।
১৮) প্রয়াগ
সতীর দুই হস্তের ‘আঙ্গুলী’। দেবী “ললিতা” ও ভৈরব “ভব”। কলিকাতা হতে 512 মাইল এলাহাবাদ ষ্টেশন তথা হতে প্রায় দেড়ক্রোশ দূরে বেণীতীর্থ ঘাট অবস্থিত। এখানে মুক্ত বেণী, গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী সঙ্গম। সঙ্গমস্থলে যমুনা পশ্চিম দিক হতে এসে মিলিত হয়েছে ও সরস্বতী অন্তঃসলিলা। এখান হতে ১ ক্রোশ দূরে ললিতা দেবীর পীঠস্থান ও আলোপী দেবী বিরজমান। এখানকার প্রধান কার্য বেণীমাধব দর্শন, মস্তক মুণ্ডন ও পূর্ব পুরুষের শ্রাদ্ধাদি করা। এখানে দ্বাদশ বৎসর অন্তর মাঘ মাসে কুম্ভ মেলা হয়। প্রয়াগধাম হিন্দু জাতির শ্রেষ্ঠতম তীর্থ। ব্রহ্মা বেদ লাভার্থে এই স্থানে অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পাদন করেন। ১) গঙ্গাদ্বারা (হরিদ্বার) ২) প্রয়াগ ৩) ধারা (উজ্জয়িনী) এবং ৪) গোদাবরীতট (নাসিকা) প্রতি তিন বৎসর অন্তর উক্ত চারিস্থানে কুম্ভ যোগ ঘটে ও কুম্ভ মহামেলার অনুষ্ঠান হয়।
১৯) জয়ন্তী
সতীর ‘বামজঙ্ঘা’। দেবী জয়ন্তী ভৈরব ক্রদীশ্বর শ্রীহট্ট জেলার অন্তর্গত জয়ন্তিয়া রাজ্যের ফালুজ নামক পরগণায় বাউরভাগ (বাম-উরু-ভাগ) গ্রামে বামজঙ্ঘা পীঠ অবস্থিত। স্থানীয় জনসাধারণের নিকট কালীবাড়ী খ্যাত আছে। প্রাচীনকালে জয়ন্ত প্রভতি হিন্দু নৃপতিগণ দেবীর নিকট নরবলী দিয়ে মহাপূজার অনুষ্ঠান করতেন। ১৮৩৫ খ্রিঃ বড়লার্ট নরবলি বন্ধ করে রাজা রাজেন্দ্র সিংহকে রাজ্যচ্যুত করে শ্রীহট্ট জেলার অন্তর্গত করেন এবং বার্ষিক ছয় হাজার টাকা বৃত্তি দানে স্বাধীন জয়ন্তীয়া রাজ্যের নাম লোপ করেন। কলিকাতা হতে শ্রীহট্ট এবং শ্রীহট্ট হতে কানাইঘাট নৌকা যোগে ৪৫ মাইল এবং সিলেট শিলং পথে জৈন্তু নিজ পাট হয়ে ৪৮ মােইল।
২০) কালীঘাট
সতীর ‘দক্ষিণ চরণের আঙ্গুলী’। কলিকাতার কালিঘাটে দেবী কালিকা ভৈরব নকুলেশ্বর। আদি গঙ্গায় স্নান করে মাকে দর্শন করতে হয়।
২১) কিরিটে
সতীর ‘কিরীট’। দেবী বিমলা ভৈরব সম্বর্ত্ত। ব্যাণ্ডেল বারহারোয়া শাখা লাইনের ১৩১ মাইল ইলাহীগঞ্জ লালবাগ কোর্ট ষ্টেশন। তথা হতে ৩ মাইল পশ্চিমে বটনগর গ্রামের মধ্যে তীর্থস্থান। মায়ের মন্দির অতি প্রাচীন ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ।
২২) বারানসী
সতীর ‘কুন্তল’। দেবী বিশালাক্ষী ভৈরব ‘কাল’ মনিকার্নিকার পীঠস্থান। ৪২৫ মাইল বেনারস।
২৩) কন্যাশ্রম
সতীর ‘পৃষ্ঠদেশ’। দেবী “সর্ব্বানী” ভৈরব নাম নিমিষ। চন্দ্রশেখর (চট্টগ্রাম) পর্বত সমীপবর্তী কুমারীকুণ্ড কন্যাশ্রম বলে অনুমতি হয়। কন্যাশ্রম মহাপীঠ সীতাকুণ্ড হতে প্রায় ৯ মাইল দক্ষিণে কুমিরা রেল ষ্টেশনের নিকটে পর্বতের সানুদেশে নির্জন কানন প্রদেশে কুমারীকুণ্ড অবস্থিত।
২৪) কুরুক্ষেত্র
সতীর ‘দক্ষিণ পায়ের গুলফ’। দেবী সাবিত্রী ভৈরব স্থাণুপ্রমাণে অশ্বনাথ। দিল্লী দিয়ে ৯৯৯ মাইল কুরুক্ষেত্র ষ্টেশন। তথা হতে পশ্চিমে এক ক্রোশ দূরে দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরে পীঠস্থান।
২৫) মণিবন্ধে (মণিবেদে)
সতীর ‘মনিবন্ধ করগ্রন্থি’। দেবী গায়ত্রী ভৈরব সর্ব্বনিন্দ আজমীরের নিকট পুস্কর মহাতীর্থে গায়ত্রী পর্বত। আজমীর হতে ছয় মাইল দূরে অবস্থিত। পুস্কর হ্রদের চতুর্দিকের পরিধি প্রায় ২ মাইল। তিন দিকে পর্বত বেষ্টিত। পুস্কর তীর্থের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অত্যন্ত মনোরম। পুস্কর তীর্থ গায়ত্রী সাধনার প্রকৃষ্ট স্থল।
২৬) শ্রীহট্ট
সতীর ‘গ্রীবা’। দেবী মহালক্ষ্মী ভৈরব ‘সম্বরানন্দ’। শ্রীহট্ট শহর হতে ঈশান কোণে ৯ মাইল দূরবর্তী কালাগোল নামক স্থানে পীঠপ্রস্তর বালুকা মধ্যে প্রোথিত ও নিম্নগামী উত্তর-দক্ষিণে লম্বমান একটি কাল প্রস্তর হতে গ্রীবাচিহ্ন আছে। পীঠ প্রস্তরের মধ্য দিয়ে একটি পার্বত্য স্রোতধারা কোনকালে প্রাবাহিত ছিল। প্রস্তর পীঠ গহ্বর মধ্যে সর্বদা জল আছে। কাহারও মতে শ্রীহট্ট শহর হতে ৩ মাইল দূরবর্তী পেটাটিকির গ্রামে জৈনপুর গ্রীবাপীঠ অবস্থিত। সেখানেও শিবটিলার উপর সর্ব্বানন্দ ভৈরবের লিঙ্গ চিহ্ন আছে। জৈনপুর গ্রামে এককালে কাল পাথর মহাপীঠ বলে লোক প্রসিদ্ধি আছে। শিবচতুর্দশী তিথিতে মেলা হয়।
২৭) কাঞ্চিদেশ
সতীর ‘কঙ্গাল’। দেবী বেদগর্ভা ভৈরব ‘রব ভৈরব’। উত্তর বাহিনী কোপাই নদীর তীরে পীঠস্থান। এখানে একটি কুণ্ড আছে। তৎপার্শ্বে পূজাদি করে থাকে। চৈত্র সংক্রান্তিতে মেলা বসে।
২৮) কাল মাধব
সতীর ‘বাম নিতম্ব’। দেবী কালী ভৈরব অসিতাঙ্গ। শোন নদে এই পীঠস্থান স্থাপিত। ই.আই. রেলে কৈলাশ ষ্টেশনে ও তাহার নিকটে পীঠস্থান। কার্ত্তিক মাসের কৃষ্ণা চতুর্থী তিথিতে অর্ন্ধ রাত্রিতে দেবীর বিশেষ পূজা প্রতি বৎসর হয়ে থাকে।
২৯) শোন নদ
সতীর ‘দক্ষিণ নিতম্ব’। দেবী নর্ম্মদা (শোনাখ্যা) ভৈরব ভদ্রসেন নর্ম্মদা নদীর তটে এই পীঠস্থান অবস্থিত। মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর শহর হতে ১২-১৩ মাইল দূরে প্রপাত অবস্থিত। ভেড়াঘাট বা ভৃণ্ডক্ষেত্র নামে সুবিখ্যাত। গৌরীশঙ্কর মন্দির বানকুণ্ড অবস্থিত। এখান হতে বানলিঙ্গ শিব উৎপন্ন হয়।
৩০) রামগিরি
সতীর ‘দক্ষিণ স্তন’। দেবী শিবাণী ভৈরবচণ্ড। মধ্যপ্রদেশের নাগপুর সন্নিহিত ও বিলাসপুরের ৬ মাইল উত্তর-পশ্চিম কোণে পর্বতোপরি পীঠস্থান অবস্থিত। আধুনিক নাম রামটেক।
৩১) বৃন্দাবন
সতীর ‘কেশ জাল’। দেবী উমা ভৈরব ভূতেশ। বৃন্দাবনে কেশীঘাটের নিকট একটি নব নির্মিত মন্দিরে দক্ষতনয়া সতীর কেশ পতন হয়েছিল। ভৈরব ভূতেশ্বের মন্দির মথুরায়। প্রায় ২শত হাত উচ্চ একটি গোলাকার পাষাণ রচিত স্বম্ভের গাত্রে মুখ ও চোখ ইত্যাদি ভূতেশ্বর মূর্তি। কলিকাতা হতে ৮৩৬ মাইল দূরে অবস্থিত।
৩২) শুচিদেশ
সতীর ‘উর্দ্ধদন্ত’ পংক্তি পতিত হয়। তথায় দেবী নারায়ণ ভৈরব সংহার। পঞ্চসাগরে সতীর আধো দন্ত দেবী বাহারী ভৈরব মহারুদ্র। হরিদ্বারের নিকটবর্তী পঞ্চকুণ্ডই উক্ত মহাপীঠস্থান।
৩৩) করতোয়া তট
সতীর ‘তল্প’। (শয্যা আসনাদি) দেবী অপর্ণা ভৈরব নাম বামন। উত্তরবঙ্গের বগুড়া, শহরের প্রায় ১১ ক্রোশ দক্ষিণে আদি করতোয়ার পশ্চিম তটে ভাবতা নামক স্থানে জঙ্গলাকীর্ণ গ্রাম। তথায় ভবাণী মন্দিরে পীঠস্থান।
৩৪) শ্রী পর্বত
সতীর ‘দক্ষিণ গুলফ’। দেবী সুনন্দা, শ্রীসুন্দরীনন্দ ভৈরব। শ্রীপর্বতে কাশ্মীরের মধ্যে হিন্দুকুশ পর্বতমালার নিচে লাদাকের নিকট তীর্থস্থান বিরাজিত।
৩৫) বিভাসক
সতীর ‘বাম গুলফ’। দেবী ভীমরূপা ভৈরব সর্বানন্দ। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার তমলুকের নিকট অতি প্রাচীন নগর। মহাভারতে সংস্কৃত নাম তাম্রলিপ্ত। সম্রাট আশোকের পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রা বৌদ্ধধর্ম প্রচারার্থে অর্ণবযানে প্রথম তমলুক বন্দরে আগমন করেন। চৈনিক পরিব্রাজক ফাহিয়ান (৪১১-৪১২ খ্রিঃ) দুই বৎসর তাম্রলিপ্তে বাস করেন। ফাহিয়ান এই স্থানে ২৪ টি সঙ্গারাম প্রত্যক্ষ করেছেন। ৬৩৫ খ্রিঃ অব্দে হুয়েন সাং এই নগর হতে সমুদ্র সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। বর্তমানে সমুদ্র ৭০ মাইল দূরে সরে গিয়েছে। বৌদ্ধধর্ম প্রভাব অন্তর্হিত হলে ক্রমশঃ তমলক তান্ত্রিক সাধনার শ্রেষ্ঠস্থানে পরিগণিত হয়। বিগ্রহ প্রস্তরের সম্মুখভাগ খোদিত। ইহা উগ্রতারা মূর্তির অনুরূপ। কালা পাহাড় এই দেবীকে দর্শন করে পরমপ্রীত হয়ে ফার্সী ভাষায় একখানা দলিল লিখে পূজকদের নিকট রেখে যান, যাহা এখনও আছে। ১৮শ শতাব্দিতে দুরন্ত বর্গী সৈন্যদল নিম্নবঙ্গ লুণ্ঠনে ব্যাপৃত ছিল। তখনও তাহারা কোন প্রকার অনিষ্ট করা দূরে থাকুক ষোড়শোপচারে পূজা করে বহুমূল্য রত্নালঙ্কারে দেবীকে ভূষিত করেন। ভীমা দেবীর মন্দির ৬০ ফুট উচ্চ, ভিত্তি ৩০ ফুট উচ্চ। বর্ণ ভীমা দেবীর নিম্নে সোপানাবলির ভিতরে ভূতনাথ ভৈরব আছেন। মন্দিরের উত্তর দিকে একটি কুণ্ড বা পুষ্করিনী আছে।
৩৬) প্রভাস
সতীর ‘উদর’। দেবী চন্দ্রভাগা ভৈরব বক্রতুণ্ড পীঠস্থান বর্তমান নাম সোমনাথ। ইহা পশ্চিম ভারতের কতিয়াবাড়ের অন্তর্গত জুনাগড় রাজ্যে অবস্থিত। সোমনাথ মন্দির রাণী অহল্যাবাই (১৭৩৫-১৭৯৫) নির্মাণ করেন। মন্দিরের চূড়াদেশ হতে দুইশত মণ ওজনের একটি স্বর্ণশৃঙ্খল বিলম্বিত ছিল। শত শত ঘন্টা এই শৃঙ্খলমালার সংলগ্ন থাকত। সন্ধ্যাকালে আরতীর সময় ২০০ ব্রাহ্মণ ঐ স্বর্ণশৃঙ্খল সঞ্চালন করে ঘন্টাধ্বনি করতেন। মন্দিরের অভ্যন্তরভাগ গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকলেও স্বর্ণময়ী দীপাধারে সুসজ্জিত ও লম্বিত নীল, রক্ত ও পীতবর্ণের শত শত হীরক খণ্ডের উজ্জ্বল কিরণজালে দিবালোকের ন্যায় প্রতীত হয়। মধ্য প্রকোষ্ঠ ১০ হাত দীর্ঘ ও ৩ হাত প্রস্থ এবং শূণ্যগর্ভ শিবলিঙ্গ বিরাজমান। চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ যাত্রীর সমাগম হয়। কলিকাতা হতে ৮২৯ মাইল দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত।
৩৭) ভৈরব পর্বত
সতীর ‘উর্দ্ধ ওষ্ঠ’। দেবী মহাদেবী (অবন্তী) ভৈরব লম্বকর্ণ অবন্তদেশে শিপ্রা নদীর তীরে ভৈরব পর্বতে অবস্থিত। বর্তমান নাম উজ্জয়িনী। মধ্যভারতের গোয়ালিয়ার জেলার অন্তর্গত। হাওড়া হতে বাইনী জংশন হয়ে ১০৭৩ মাইল দূরে এই মহাপীঠ অবস্থিত।
৩৮) মগধ
সতীর ‘দক্ষিণ জংঘা’। দেবী সর্বানন্দকরী ভৈরব ব্যোমকেশ।
৩৯) জন্মস্থান
সতীর ‘চিকুক’। দেবী ভ্রামরী বিকৃত্যক্ষ ভৈরব পঞ্চবটির নাসিক বর্তমান নাম। নাসিক শহর হতে ৩০ মাইল উত্তরে সহ্যাদি পর্বতমালার অন্তর্গত সপ্তশৃঙ্গ নামক পর্বতোপরি এই পীঠস্থান অবস্থিত। এইখানে নাম ধর্মের একটা মহাক্ষেত্র ছিল। নবনাথের অন্যতম মৎস্যেন্দ্রনাথের সমাধি এই স্থানে বর্তমান। এখনও যোগীরা মৎস্যেন্দ্রনাথের সমাধিস্থল দেখতে আসেন। দেবী সপ্তশৃঙ্গী দর্শনার্থে চৈত্রের শুক্লাপঞ্চমী এবং শারদিয়া পূর্ণিমাতে বিস্তর লোক সমাগম হয়।
৪০) গোদাবরী তীর
সতীর ‘ দক্ষিণ গণ্ড’। দেবী বিশ্বমাতৃকা ভৈরব দণ্ডপাণি এবং গোদাবরী তীরেই সতীর ‘বাম গণ্ড’ পতিত হয়। দেবী রাকিণী ভৈরব ‘বৎসনাভ’। এইক নদীর তীরে পৃথক পৃথক ২টি মহাপীঠ নাসিকে কুম্ভ মেলার অনুষ্ঠান হয়। ঐ সময়ে গোদাবরী স্নান ও ত্র্যম্বকেশ্বর ভৈরব দর্শন বিশেষ মাহাত্ম্যপূর্ণ।
৪১) রত্নাবলী
সতীর ‘দক্ষিণ স্কন্ধ’। দেবী কুমারী বা শিবা। ভৈরব নাম শিব। নেপালের বাগমতী নদী ও রত্নাবল নদীর সঙ্গমস্থলে প্রমোদতীর্থ এই মহাপীঠ অবস্থিত। বাগমতী নদীর পশ্চিম তীরে সুপ্রসিদ্ধ ভৈরবের পশুপতির মন্দির।
৪২) ক্ষীরগ্রাম (বর্দ্ধমান)
সতীর ‘দক্ষিণ চরণাঙ্গুষ্ঠ’। দেবী যুগাদ্যাভৈরব ক্ষীরকণ্ঠ। বৈশাখী সংক্রান্তিতে মেলা বসে। পাষাণময়ী দেবী মূর্তি একটি পুষ্করিণীতে সমুদয় বৎসর সমভাবে জলে নিমগ্ন আছে। শুধু উক্ত সংক্রান্তি দিনে দেবী জল হতে উত্তোলিত হয়ে পূজিত হন। বর্ধমান ষ্টেশন হতে ২০ মাইল উত্তরে কাটোয়ার নিকট অবস্থিত।
৪৩) মিথিলায়
সতীর ‘বামস্কন্ধ’। দেবী মহাদেবী ভৈরব মহোদর নেপালের তরাইয়ে জনকপুর রোড ষ্টেশনের সন্নিকটে পীঠস্থান অবস্থিত। এখানে দেবী শিলারূপিনী। পর্বাদি উপলক্ষে এখানে বহুলোকের সমাগম হয়। ইহার নিকটেই গৌতমাশ্রম। ন্যায়- দর্শন প্রণেতা গৌতম ঋষি রাজর্ষি জনকের পুরোহিত ছিলেন। ইহা ভরোবা পরগণার অন্তর্গত ব্রহ্মপুত্র গ্রামে অবস্থিত। মিথিলা বা বিদেহ রাজ্য বিহার প্রদেশের অন্তর্গত। বর্তমান ত্রিহুত (তীরভুক্তি) তন্ত্র-শাস্ত্রে বিদেহ তীরভুক্তি রাজ্যের এইরূপ সীমা নির্দিষ্ট আছে। কলিকাতা হতে ৩৯০ মাইল দূরে অবস্থিত।
৪৪) নলহাটি
সতীর ‘নলাপতে’। দেবী কালিকা ভৈরব যোগীশ। বীরভূম জেলার নলহাটি গ্রামে এই পীঠস্থান অবস্থিত। উচ্চ টিলার উপর দেবীর মন্দির। মন্দিরাভ্যন্তরে প্রাচীর গাত্রে কালিকা দেবীর মূর্তি সর্বদা সিন্দুরে মণ্ডিত থাকায় স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় না। দীপান্বিতার সময় মেলা হয় ও বহু যাত্রীর সমাগম হয়। কলিকাতা হতে ১১৪ মাইল।
৪৫) বর্ধমান
সতীর ‘মুণ্ড’। দেবী জয়দূর্গা। ভৈরব ক্রোধীশ। বর্ধমান জেলার কাটোয়ার নিকটবর্তী জয়পুরে অবস্থিত। কলিকাতা হতে ৯০ মাইল কাটোয়া রেল ষ্টেশন।
৪৬) বক্রেশ্বর
সতীর ‘মন’ বা ‘ভ্রূমধ্য’। দেবী মহিষমর্দ্দিনী ভৈরব বক্রনাথ। এই মহাপীঠ বীরভূম জেলার দুবরাজপুরের নিকট অবস্থিত। পাসহরা নদীর তীরে পীঠস্থান। এইখানে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ আছে। শিবরাত্রিতে মেলা হয়। দেবী অষ্টধামু নির্মিত। এই পীঠে বিখ্যাত তান্ত্রিক অঘোরী বাবা সিদ্ধি লাভ করেন।
৪৭) যশোর
সতীর ‘কর কমল’। দেবী যশোরেশ্বরী ভৈরব চণ্ড। খুলনা জেলার অন্তর্গত ঈশ্বরীপুরে অবস্থিত। হাসানাবাদ রেল ষ্টেশন হতে ঈশ্বরপুরে অবস্থিত। হাসানাবাদ রেল ষ্টেশন হতে ঈশ্বরীপুর ২৫ মাইল। এখানে প্রাচীন যশোর রাজ্যের রাজধানী ছিল। যমুনা ও ইছামতী নদীর সঙ্গমস্থলে ঈশ্বরপুর। মহারাজ প্রতাপদিত্যের রাজ রাজ্যেশ্বরী কুলদেবতা যশোরেশ্বরী। পীঠ মূর্তি যশোরশ্বেরী কষ্টিপাথরে নির্মিত লোলরসনা ভীষণা কালী মূর্তি।
৪৮) অট্টহাস
সতীর ‘নিম্ন ওষ্ঠ’। দেবী ফুল্লুরা ভৈরব বিল্বেশ বীরভূম জেলার অন্তর্গত লাভপুর গ্রামের নিকট অবস্থিত। প্রস্তরময় অধরোষ্ঠই দেবীরূপে পূজিত হয়ে থাকেন। ইহা প্রায় দুই ফুট লম্বা, দেড় ফুট চওড়া এবং এক ফুট উচ্চ। এই পীঠস্থানে রটন্তী চতুর্দ্দশীর দিন মেলা ও জনসমাগম হয়।
৪৯) সন্দীপুর
সতীর ‘হার’। দেবী নন্দিনী ভৈরব নন্দিকেশ্বর। বীরভূম জেলার সাইথিয়া নামক স্থানের সন্নিকটে এই পীঠস্থান অবস্থিত। দুইটি বট বৃক্ষ আছে। তাহার মধ্যস্থানে প্রস্তর বাঁধা বেদী বা আসন।
৫০) লঙ্কা
সতীর ‘নুপুর’। দেবী ইন্দ্রাক্ষী ভৈরব রাক্ষসেশ্বর। দেবী দ্বিভূজা, পতী বস্ত্রযুক্তা বাম হস্তে বজ্র এবং দক্ষিণ হস্তে বর প্রদায়িনী। বর্তমান শ্রীলঙ্কা।
৫১) বিরাট
সতীর ‘বাম পদাঙ্গুলীসমূহ’। দেবী অম্বিকা ভৈরব অমৃত। মহাভারতে বর্ণিত বিরাট বা মৎস দেশ রাজপুতনার জয়পুর আলোয়া-ভরতপুর অঞ্চলে অবস্থিত। বিরাট নগরে যুধিষ্ঠির দূগা আরাধনা করেছিলেন। এই মহাপীঠের নিকটে পঞ্চপাণ্ডব অজ্ঞাত বাসে ছিলেন। প্রাচীন বিরাট নগর বহু শত বর্ষ পরিত্যক্ত ছিল। তিনশত বর্ষ হয় পুনরায় লোক বসতি হয়েছে। এক সময় বিরাটে তাম্র খনি ছিল। তাই আইন-ই আকবরীতে যুদ্ধে পরাজিত করে স্বরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।
অজ্ঞাত্ত্বা ভৈরবং পীঠং পীঠ শক্তিঞ্চশঙ্কর।
প্রাণনাথ ন্যসিধেত্তুকল্প কোটিজপাদিভিঃ
পীপ পীঠাধিষ্ঠাতা ভৈরব এবং পীঠশক্তির তত্ত্ব না জানিয়া পীঠস্থানে বসিয়া কোটি কল্পকাল জপ ও পূজাদির অনুষ্ঠান করলে সাধনা সহজে ফলপূস হয় না।
No Comment! Be the first one.