কংস তার আসুরিক মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করার পর পুতনা বধ নামক এক রাক্ষসীকে শহরে, গ্রামে এবং গোচারণভূমিতে সমস্ত শিশুদের হত্যা করতে নির্দেশ দিল। এদিকে অনুমতি না নিয়েই পুতনা গোকুলে নন্দ মহারাজের গৃহে প্রবেশ করে। এক অতি রূপবতী রামনীর রূপ ধারণ করে সে যশোদা মায়ের ঘরে প্রবেশ করল।
পাপিনী পুতনা নানা রকম যাদুবিদ্যা জানত। সেই যাদুবিদ্যার প্রভাবে সে কি অপূর্ব সুন্দরী যুবতীর বেশ ধারণ করল। তার উন্নত নিতম্ব, নিটোল কুচযুগল, কানে দুল এবং কেশপাশে ফুলমালায় বিভুষিতা হয়ে সে এক অপূর্ব সুন্দর রূপ ধারণ করল। তার ক্ষীন কটিতট তাকে বিশেষভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলেছিল। মৃদু হাস্যে ভ্রূ-ভঙ্গি করে সে সকলের দিকে তাকাতে লাগল এবং সমস্ত ব্রজবাসীরাই তার রূপে মোহিত হল।
সরল গোপিকারা মনে করল যে, স্বয়ং লক্ষ্মীদেবীই যেন তাঁর পতি শ্রীকৃষ্ণের দর্শন করতে এসেছেন। পুতনার অপূর্ব সুন্দর রূপ দর্শন করে কেউই তাকে বাধা দিল না, এবং সে নির্বিঘ্নে নন্দ মহারাজের গৃহে প্রবেশ করল। শিশুঘাতিনী পুতনা দেখল যে, শ্রীকৃষ্ণ একটা শয্যার উপরে শুয়ে আছে এবং সে বুঝতে পারল যে, সেই শিশুটির মধ্যে এক অজেয় শক্তি নিহিত রয়েছে। পুতনা ভাবল, “এই শিশুটি এত শক্তিশালী যে নিমেষের মধ্যে সে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে।
একটি ছোট্ট শিশুর মতো শ্রীকৃষ্ণ তাঁর দুটি চোখ বন্ধ করলেন, যেন তিনি পুতনার মুখ দর্শন করতে চাইলেন না। ভগবদ্ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের এই চোখ বন্ধ করার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। ভগবদ্গীতায় বর্ণিত হয়েছে, ‘পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুস্কৃতাম্।’ প্রথম যে অসুরটিকে তিনি সংহার করতে যাচ্ছিলেন সে হচ্ছে একটি স্ত্রীলোক, এবং বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে স্ত্রী, ব্রাহ্মণ, গাভী ও শিশু হত্যা করা নিষিদ্ধ। বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে নিষিদ্ধ হলেও শ্রীকৃষ্ণ পুতনাকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাই তিনি চোখ বন্ধ না করে পারেননি।
শিশু শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর চোখ বন্ধ করলেন, পুতনা তখন তাঁকে কোলে তুলে নিল। সে তখন জানত না যে, সে স্বয়ং মৃত্যুকে তার কোলে তুলে নিচ্ছে। পুতনা তার স্তনে অতি তীব্র বিষ লাগিয়ে এসেছিল এবং শিশু শ্রীকৃষ্ণকে কোলে নিয়েই সে তৎক্ষণাৎ তাঁকে তার স্তন দান করল, যাতে সেই স্তন্য পান করা মাত্রই তাঁর মৃত্যু হয়। শ্রীকৃষ্ণ ক্রদ্ধভাবে তৎক্ষণাৎ সেই স্তন গ্রহণ করে দুগ্ধরূপী বিষের সঙ্গে সেই রাক্ষসীর প্রাণবায়ুও শোষণ করে নিল।
শ্রীকৃষ্ণ এতই কৃপাময় যে, সেই রাক্ষসী যেহেতু তার বুকের দুধ দান করবার জন্য তাঁর কাছে এসেছিল, তাই তিনি তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেছিলেন এবং তার সেই কার্যকলাপ মাতৃবৎ বলে গ্রহণ করেছিলেন। আর তার বীভৎস কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য তাকে তৎক্ষণাৎ সংহার করেছিলেন। আর শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা নিহত হওয়ার ফলে সে মুক্তি লাভ করেছিল।

তখন তার বিরাট রাক্ষসীর রূপ প্রকাশ পেল। তার হাত-পা ছড়িয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং তার মুখ হা হয়ে রইল। ইন্দ্রের বজ্রাঘাতে বৃত্রাসুরের যেভাবে পতন হয়েছিল, পুতনাও ঠিক সেইভাবে ভূপতিত হল। তার মাথার লম্বা চুল সারা শরীরে ছড়িয়ে রইল। তার বিশাল শরীরের পতনের ফলে ছয়-ক্রোশ জায়গা জুড়ে সমস্ত গাছপালা বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। তার সেই অতি বিশাল শরীর দেখে সকলেই বিস্ময়তিভূত হয়ে পড়েছিল। তার মুখের দাঁতগুলি ছিল লাঙ্গলের ফলার মতো তীক্ষ্ণ, নাসারন্ধ্র পর্বত-গহ্বরের মতো গভীর, তার স্তনদ্বয় গিরিশিখরচ্যুত শিলাখন্ডের মতো বিশাল, তার কেশরাশি বিক্ষিপ্ত এবং তাম্রবর্ণ, চোখ দু’টি অন্ধকুপের মতো গভীর, জঙ্ঘাদ্বয় নদীর দু’টি তটের মতো, তার হাত দু’টি সেতুর মতো এবং তার উদর জলশূণ্য হ্রদের মতো মনে হচ্ছিল। তার পতনের ভীষন শব্দে গোপ এবং গোপিকাদের কর্ণ বিদীর্ণ হল এবং প্রচন্ডভাবে হৃৎকম্প হতে লাগল।
শ্রীকৃষ্ণ যখন তার প্রাণবায়ু শুষে নিল, তখন পুতনা হাত-পা ছাড়িয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আর্তনাদ করতে লাগল এবং তার সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গেল। এইভাবে আর্তনাদ করতে করতে যখন তার মৃত্যু হল, তখন চারদিকে এক প্রচন্ড শব্দ হল, নদ-নদী, গিরি, তরু, ধরণী কেঁপে উঠল। লোকেরা মনে করল যেন চারদিকে বজ্রপাত হচ্ছে। গোপিকারা যখন দেখলেন যে, শিশু শ্রীকৃষ্ণ নির্ভয়ে সেই মৃত রাক্ষসীর বক্ষস্থলে খেলা করছে, তখন শীঘ্র তাঁরা তাঁকে সেখান থেকে তুলে নিলেন। এইভাবে পুতনা রাক্ষসীর বিভীষিকা সমাপ্ত হল।
No Comment! Be the first one.