পদ্মপুরাণ উত্তরখণ্ড ৮৮-৮৯ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে- একবার দেবর্ষি নারদ স্বর্গের কল্পবৃক্ষজাত দিব্যপুষ্প সংগ্রহ করে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করতে দ্বারকায় এলেন। শ্রীকৃষ্ণ দেবর্ষি নারদকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে পাদ্য, অর্থ প্রদান করে বসার জন্য আসন প্রদান করলেন। আসন প্রদান করে নারদ সেই দিব্যপুষ্প ভগবানকে নিবেদন করলেন। ভগবান তখন পুষ্পগুলো তাঁর ষোল হাজার মহিষীর মধ্যে বণ্টনকালে সত্যভামার কথা ভুলে যান। এতে সত্যভামা অভিমান করেন। তাঁর মান ভাঙাতে শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গলোক থেকে সেই দিব্যপুষ্পের কল্পবৃক্ষ এনে সত্যভামার প্রাসাদ প্রাঙ্গণে রোপন করেন। এ ঘটনায় কৌতুহলী হয়ে সত্যভামা ভগবানকে জিজ্ঞেস করলেন, হে প্রাণনাথ, আমি পূর্বজন্মে কী এমন দান, তপস্যা বা ব্রত পালন করেছিলাম যার ফলে সত্যলোকে জন্ম নিয়েও উর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হয়ে আজ আপনার অর্ধাঙ্গিনী হতে পেরেছি? এই প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্মিত হেসে সত্যভামাকে বললেন- প্রিয়ে, তুমি পূর্বজন্মে যেসকল ব্রত অনুষ্ঠান করেছিলে তার সমস্ত কিছুই আজ আমি তোমাকে বর্ণনা করছি, প্রকাগ্রচিত্তে শ্রবণ কর।
সত্যযুগের শেষভাগে মায়াপুরীতে (হরিদ্বার) দেবশর্মা নামক অত্রিকুলজাত এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। তিনি ছিলেন সমগ্র বেদশাস্ত্রে পারঙ্গম, অতিথিবৎসল, অগ্নিহোত্র ও সূর্যব্রত পালনে অত্যন্ত নিষ্ঠাপরায়ণ। প্রতিদিন নিয়মিত সূর্য আরাধনার ফলে তিনি সাক্ষাৎ সূর্যদেবের মতো জ্যোতি লাভ করেছিলেন, ফলে তাকে দ্বিতীয় সূর্যদেবরূপে ভ্রম হতো। তাঁর ছিল একটি মাত্র সন্তান- গুণবতী নামক এক কন্যা। তাঁর সেই একমাত্র কন্যা গুণবতীকে তিনি চন্দ্র নামক এক শিষ্যের সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন। ব্রাহ্মণ দেবশর্মা, চন্দ্রকে নিজের সন্তনের মতো স্নেহ করতেন, আর সেই জিতেন্দ্রিয় চন্দ্রও দেবশর্মাকে পিতৃতুল্য জ্ঞান করতেন। একদিন দেবশর্মা ও চন্দ্র উভয়ে একসঙ্গে কুশ ও সমিধ সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে হিমালয়ে গমন করেছিলেন। সেখানে কোনো এক অঞ্চলে ইতস্তুত ভ্রমলণ করতে করতে তারা হঠাৎ এক ভয়ংকর রাক্ষসের সম্মুখীন হলেন। রাক্ষসটিকে তাদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখে তাদের সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগল। তখন রাক্ষস এসে তাদের দুজনকেই মেয়ে ফেলল। তবে জীবনভর সূর্যোপাসনা ও অন্যান্য ধর্মকর্মাদি করার ফলে স্বয়ং ভগবান তাঁদের ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁরা মুক্তিলাভ করেছিলেন।
অচিরেই এই দুঃসংবাদ গুণবতীর কাছে পৌছল। তার পিতা ও পতি উভয়েরই রাক্ষসের হাতে মৃত্যুর সংবাদ শুনে সে বিলাপ করতে লাগল। কিন্তু গুণবতী ধৈর্যধারণ করে পিতা ও পতির পারলোকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করল। শান্তভাবে সত্য, শৌচাদি পালনপূর্বক নিজেকে বিষ্ণুর আরাধনায় সমর্পন করে সে ঐ নগরীতেই বাস করতে লাগল। গুণবতী সারা জীবন গভীর নিষ্ঠাসহকারে বিধিপূর্বক দুটি ব্রত পালন করেছিল: একাদশী ব্রত ও কার্তিক ব্রত। ভগবান বলেছেন, এ দুটি ব্রতের ফলেই যেমন পুণ্য সঞ্চয় হয়ে ধন-জন প্রাপ্ত হওয়া যায়, তেমনি মোক্ষও লাভ হয়। স্বয়ং ভগবান আরো উল্লেখ করেছেন যে, কার্তিক মাসে সূর্যের তুলা রাশিতে অবস্থানকালে যে প্রাতঃস্নান করে, সে মহাপায় হলেও মুক্তি লাভ করে। যে মানুষ কার্তিক মাসে স্নান জাগরণ দীপদান ও তুলসীসেবা করে, সে অবশ্যই ভগবান বিষ্ণুকে লাভ করতে সক্ষম হয়। এই সময় বিষ্ণুর মন্দির মার্জন বা ঝাড়ু দিয়ে, স্বস্তিক আদি নিবেদন করে যে বিষ্ণুর আরাধনা করে, সে জীবন্মুক্ত স্তর লাভ করে। যে কার্তিক মাসের তিনদিন মাত্র এই ব্রত পালন করে সে দেবতাদেরও পূজনীয়। আর আজন্ম যে এই কার্তিক ব্রতের অনুষ্ঠান করে, তার তো কথাই নেই।
গুণবতীও এভাবে প্রতি বছর, আজন্ম কার্তিক ব্রত পালন করে যেতে লাগল। অবশেষে এক কার্তিক ব্রতের সময় সে জ্বরে পীড়িত হয়ে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ল। তবুও ঐ জ্বরে পীড়িত অবস্থাতেও সে কোনো রকমে ধীরে ধীরে স্নান করার জন্য গঙ্গার তীরে উপস্থিত হলো। জলে নামা মাত্রই শীতে কাতর হয়ে কাঁপতে কাঁপতে গুণবতী সেই গঙ্গাতীরেই অচেতন হয়ে পড়ল। এরপর গুণবতী দেখল আকাশ থেকে এক সুদৃশ্য বিমান নেমে আসছে। সেই বিমান গরুড় চিহ্নিত পতাকায় সুশোভিত এবং সেই বিমানে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মধারী বিষ্ণুদূতগণ রয়েছেন। বিমানটি তার কাছে এলে গুণবতী এক দিব্যরূপ ধারণ করে তাতে আরোহন করল। তাকে চামর ব্যঞ্জন করতে করতে সম্মান জ্ঞাপন করে ভগবানের পার্ষদগণ বৈকুণ্ঠে নিয়ে চললেন।
পরমেশ্বর ভগবান এরপর মহিষী সত্যভামাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ব্রহ্মাদি দেবতাদের প্রার্থনায় আম যখন এই পৃথিবীতে অবতরণ করলাম, তখন আমার সমস্ত পার্ষদগণও আমার সঙ্গে এই পৃথিবীতে এসেছে। হে প্রিয়ে, এই যে সমস্ত যাদবকে দেখছ, এরা সকলেই আমার পার্ষদ। তারা আমার অত্যন্ত প্রিয়। যিনি পূর্বে গুণবতীরপিতা দেবশর্মা ছিলেন, সেই তিনিই এখন সত্রাজিৎ। গুণবতীর স্বামী চন্দ্র এখন অক্রুর, আর সত্যভামা তুমিই হচ্ছ সেই গুণবতী। কার্তিক ব্রত পালন করে তুমি আমার অত্যন্ত প্রসন্নতা বিধান করেছিলে। পূর্বজন্মে তুমি আমার মন্দিরের দ্বারে যে তুলসীবৃক্ষ রোপন করেছিলে, এখন তা এক কল্পবৃক্ষের রূপ ধারণ করেছে। পূর্বে কার্তিক মাসে তুমি যে দীপদান করেছিলে, তার প্রভাবে তোমার গৃহে আজ লক্ষ্মী অচলা হয়ে আছেন। আর তুমি অনুষ্ঠিত ব্রতাদির সমস্ত ফল তুমি বিষ্ণুকে পরম পতি জ্ঞানে নিবেদন করেছিলে। তাই তুমি আজ আমার পত্নী হয়েছ। যেহেতু তুমি মৃত্যুর সময় পর্যন্ত আমার প্রিয় কার্তিকব্রত পালনে অনড় ছিলে, তাই তার প্রভাবে তোমার থেকে আমার কখনও বিচ্ছেদ হবে না।
No Comment! Be the first one.