স্কন্দপুরাণে (বিষ্ণুখণ্ড, কার্তিকমাস মাহাত্ম্য, ৭ম অধ্যায়) আছে- পূর্বকালে দ্রাবিড়দেশে বুন্ধ নামে এক ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিল খুবই দুষ্টা প্রকৃতির এবং দুরাচার সম্পন্না। ঐ স্ত্রীর সংসর্গে থাকার ফলে ব্রাহ্মণের আয়ু ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হলেন। পতির মৃত্যুর পরেও ঐ স্ত্রীলোকটি আরো বিশেষভাবে ব্যভিচারে লিপ্ত হলো। এমনকি লোকনিন্দার ভয় না করে সে নির্লজ্জের মতো ব্যবহার করতে লাগল। তার কোনো পুত্র বা ভাই ছিল না। সে সর্বদাই ভিক্ষার অন্ন ভোজন করত। নিজের হাতে প্রস্তুত না করে সর্বদাই পরের বাড়ি থেকে ভিক্ষা করে বাসি অন্ন খেত এবং অনেক সময় অপরের বাড়িতে রান্না করতে যেত। তীর্থযাত্রা আদি শুভকর্ম থেকে সর্বদাই দূরে থাকত। সে কখনো কোনো ভালো কথায় কর্ণপাত করত না। একদিন এক বিদ্বান তীর্থযাত্রী ব্রাহ্মণ তার গৃহে আগমন করলেন। যার নাম ছিল কুৎস। তাকে (ঐ স্ত্রীকে) ব্যভিচারে আসক্ত দেখে সেই ব্রহ্মর্ষি কুৎস বললেন- ওরে মূর্খ নারী, মনোযোগ সহকারে আমার কথা শ্রবণ কর। পৃথ্বি আদি পঞ্চভূতে তৈরি এই রক্তমাংসের শরীর, যা কেবল দুঃখেরই কারণ, তুই তাকে যত্ন করছিস? এই দেহ জলের বুদবুদের মতো, একদিন যা অবশ্যই বিনষ্ট হবে। এই অনিত্য শরীরকে যদি তুই নিজ বলে মানিস তাহলে নিজে বিচারপূর্বক এই মোহ পরিত্যাগ কর। ভগবান বিষ্ণুকে স্মরণ কর এবং তার লীলাকাহিনী শ্রবণ কর। আসন্ন কার্তিক মাসে ভগবান দামোদরের প্রীতি বিধানের জন্য স্নান, দান আদি কর্ম করে গৃহে বা মন্দিরে বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে দীপ নিবেদন করে শ্রীবিষ্ণুকে পরিক্রমা করবে এবং তাঁকে প্রণাম করবে। এই ব্রত বিধবা এবং সৌভাগ্যবতী নারী উভয়েরই অবশ্য পালনীয়। যার ফলে সমস্ত প্রকারের পারের শাস্তি এবং সৌভাগ্যবতী নারী উভয়েরই অবশ্য পালনীয়। যার ফলে সমস্ত প্রকারের পাপের শাস্তি এবং সকল উপদ্রব নষ্ট হয়। কার্তিক মাসে দীপদান নিশ্চিতরূপে ভগবান বিষ্ণুর প্রীতি বর্ধন করে।
এই কথা বলে ব্রাহ্মণ কুৎস অপর একাট গৃহে গমন করলেন। তখন ঐ ব্রাহ্মণী ব্রহ্মর্ষি কুৎসের এই রকম উপদেশ শ্রবণ করে নিজ কর্মের জন্য অনুতাপ করতে লাগল এবং স্থির করল যে, সে অবশ্যই কার্তিক মাসে এই ব্রত পালন করবে। তারপর কার্তিক মাস আগত হলে সে পুরো মাস সূর্যোদয়ের সময় প্রাতঃস্নান, শ্রীবিষ্ণুকে দীপদানসহ নিষ্ঠা সহকারে এই ব্রত পালন করবে। তারপর কার্তিক মাস আগত হলে সে পুরো মাস সূর্যোদয়ের সময় প্রাতঃস্নান, শ্রীবিষ্ণুকে দীপদানসহ নিষ্ঠা সহকারে এই ব্রত পালন করল। তারপর কিছুকাল বাদে আয়ু শেষ হলে তার মৃত্যু হলো। তখন সে স্বর্গলোকে গমন করল এবং পরে মুক্তি লাভ করল। যেসকল মানুষ কার্তিক ব্রত পালন ও দীপদান আদি সম্পন্ন করে, তারা যদি এই ইতিহাস শ্রবণ করে তাহলে তারাও মোক্ষ লাভ করে।
আকাশ দীপ দানের মহিমাঃ ব্রহ্মা এরপর বললেন- হে নারদ, এখন আকাশ দীপের মহিমা শ্রবণ কর। কার্তিক মাস আগত হলে যিনি নিয়মিত ব্রাহ্মমুহূর্তে স্নান করে আকাশদীপ দান করেন তিনি সমস্ত লোকের আধিপত্য এবং অন্তে মোক্ষ লাভ করেন। এজন্য কার্তিক মাসে স্নান, দান আদি কর্ম করার পাশাপাশি ভগবান বিষ্ণুর মন্দিরে এই একমাস দীপদান করা অবশ্য কর্তব্য। মহারাজ সুনন্দন চন্দ্রশর্মা নামক ব্রাহ্মণের পরামর্শ অনুসারে এই একমাস বিধিপূর্বক ব্রত অনুষ্ঠান করেছিলেন। কার্তিক মাসে প্রতিদিন প্রাতঃস্নান করে পবিত্র হয়ে কোমল তুলসীদল দ্বারা ভগবান বিষ্ণুর পূজা এবং রাতে আকাশ দীপ দিতেন। দীপ প্রদানের সময় তিনি এই মন্ত্র পাঠ করতেন-
দামোদরায় বিশ্বায় বিশ্বরূপধরায় চ।
নমস্কৃত্যা প্রদাস্যামি ব্যোমদীপং হরিপ্রিয়ম্।।
আমি সর্বেশ্বর এবং বিশ্বরীপধারী ভগবান দামোদরকে নমস্কার করে এই আকাশদীপ প্রদান করছি, যা ভগবানের পরম প্রিয়। হে দেবেশ্বর, এই ব্রতের ফলে যেন আপনার প্রতি আমার ভক্তি বর্ধিত হয়।
এভাবে প্রার্থনা করে রাজা সুনন্দন দীপদান করতেন। ব্রহ্মমুহূর্তে উঠে পুনর্বার আকাশদীপ দিতেন। এভাবে তাঁর প্রাতঃস্নান এবং ভগবান বিষ্ণুর পূজা নিয়মিত চলতে লাগল। মাস শেষে ব্রতভঙ্গ করে আকাশ দীপের নিয়মের সমাপ্তি করলেন এবং ব্রাহ্মণ ভোজন করিয়ে এই বিষ্ণুব্রত পূর্ণ করলেন। এই পুণ্যের প্রভাবে রাজা এই পার্থিব জগতেই স্ত্রী-পুত্র-পৌত্র এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে এক লক্ষ বৎসর সুখ উপভোগ করলেন এবং অন্তকালে পত্নীসহ সুন্দর বিমানে আরূঢ় হয়ে চতুর্ভুজ (শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম দ্বারা সুশোভিত) বিষ্ণুসারূপ্য লাভ করে মোক্ষ প্রাপ্ত হলেন।
অতএব, দুর্লভ মনুষ্য জন্ম লাভ করে ভগবান বিষ্ণুর অত্যন্ত প্রিয় আকাশদীপ বিধিপূর্বক দান করা উচিত। এই সংসারে যে বিষ্ণুর প্রসন্নতা বিধানের জন্য আকাশদীপ প্রদান করে, তাকে ক্রুর মুখবিশিষ্ট যমরাজের মুখ দর্শন করতে হয় না। একাদশীতে সূর্যের তুলারাশিতে অবস্থান অথবা পূর্নিমাতে লক্ষ্মী সহিত ভগবান বিষ্ণুর প্রসন্নতা বিধানের জন্যই আকাশদীপ প্রদান করা চাই।
নমো পিতৃভ্যঃ প্রেতেভ্যো নমো ধর্মায় বিষ্ণবে।
নমো যমায় রুদ্রায় কান্তারপতয়ে নমঃ।।
প্রেতলোকগত পিতৃগণকে নমস্কার, ধর্মস্বরূপ বিষ্ণুকে প্রণাম, যমরাজকে নমস্কার, দুর্গম পথে রক্ষাকারী ইন্দ্রকেও নমস্কার।
এই মন্ত্র উচ্চারণ করে যে মানুষ পিতৃগণের নিমিত্ত আকাশে দীপদান করেন, তার পিতৃগণ নরকে থাকলেও উত্তম গতি প্রাপ্ত হন। যে দেবালয়ে, নদীর তীরে, রাজপথে, নিদ্রা যাবার স্থানে দীপদান করে সে ধণৈশ্বর্য প্রাপ্ত হয়। যে ব্রাহ্মণ বা অন্যজাতির মন্দিরে দীপ প্রজ্জ্বলন করে সে বিষ্ণুলোকে অধিষ্ঠিত হয়। যে কণ্টকাকীর্ণ দুর্গম উঁচু-নিচু পথে দীপ দান করে সে কখনো নরকে পতি হয় না। পূর্বকালে রাজা ধর্মনন্দন আকাশদীপ দানের প্রভাবে শ্রেষ্ঠ বিমানে আরোহণ করে বিষ্ণুলোকে প্রস্থান করেছিলেন।
যিনি কার্তিক মাসে হরিবোধিনী একাদশীতে ভগবান বিষ্ণুর সম্মুখে কর্পূর দিয়ে দীপ প্রজ্জ্বালন করেন তাঁর কুলে উৎপন্ন সমস্ত মানুষ ভগবান বিষ্ণুর প্রিয় ভক্ত হন এবং অন্তকালে মোক্ষলাভ করেন। পূর্বকালে কোনো এক গোপ অমাবস্যা তিথিতে ভগবানের মন্দিরে দীপ প্রজ্জ্বালন করে বারংবার জয়ধ্বনি উচ্চারণ করে রাজরাজেশ্বর হয়েছিলেন। এভাবে স্বয়ং ব্রহ্মা নারদ মুনির কাছে কার্তিক মাসে ভগবানের উদ্দেশ্যে নিয়মিত দীপ দান ও আকাশদীপ দানের মহিমা ব্যক্ত করেছিলেন। সকলেরই এভাবে কার্তিক মাসে দীপদান করা উচিত।
No Comment! Be the first one.