পদ্মপুরাণ উত্তরখণ্ড ১০৬-১০৮ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে একবার পৃথু মহারাজ নারদ মুনিকে বললেন- হে মুনিশ্রেষ্ঠ, কার্তিক ব্রত পালনকারী ব্যক্তি যে প্রকার মহান ফল প্রাপ্ত হয়, তা আপনি বর্ণনা করুন। কারা এই ব্রত অনুষ্ঠান করে থাকে ?
নারদ মুনি বললেন- হে রাজন, পুরাকালে ধর্মদত্ত নামে এক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি সর্বদা নিষ্ঠাপূর্বক শ্রীবিষ্ণুব্রত পালন ও বিষ্ণুপূজায় রত থাকতেন। তিনি দ্বাদশাক্ষর মন্ত্র জয় করতেন। অতিথি সৎকার তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। একদিন কার্তিক মাসে শ্রীহরিকে জাগরণ করার জন্যে ভগবানের মন্দিরাভিমুখে যাচ্ছিলেন; তখনও এক প্রহর রাত্রি অবশিষ্ট ছিল। ভগবানের পূজার সামগ্রী নিয়ে যেতে যেতে ব্রাহ্মণ পথিমধ্যে এক রাক্ষসীকে তার দিকে আসতে দেখলেন। তার আওয়াজ ছিল অত্যন্ত ভয়প্রদ। সারা শরীরে কাঁটা কাঁটা লোম, লক্ লক্ করছে জিহ্বা, নগ্ন শরীর থেকে উৎকট দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, আর গম্ভীর ঘর্ঘর শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসছে। ঐসব দেখে ব্রাহ্মণ ভয়ে শিউরে উঠলেন। তাঁর সারা শরীর কাঁপতে শুরু করলো। রাক্ষসী সামনে এলে কোনো প্রকারে সাহস করে পূজার সামগ্রী থেকে জল নিয়ে রাক্ষসীর ওপর ছুঁড়ে মারলেন। তিনি হরিনাম স্মরণ করতে করতে তুলসী মিশ্রিত জল রাক্ষসীর গায়ে ছুঁড়ে মেরেছিলেন। এইজন্য সেই রাক্ষসীর সমস্ত পাপ তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়ে গেল। তখন তার পূর্বজন্মের ইতিহাস স্মরণ হলো, সে বুঝতে পারল পূর্বকৃত কর্মের পরিণামেই তার এই দুর্দশা। সে ব্রাহ্মণকে দণ্ডবৎ প্রণাম করে বলল-হে ব্রাহ্মণ, আমি পূর্বজন্মের কুকর্মের ফলে এই দশা প্রাপ্ত হয়েছি। এখন কীভাবে আমি উত্তম গতি লাভ করবো আমাকে বলুন।
রাক্ষসীকে এভাবে প্রণাম করে পূর্বজন্মের কাহিনী বর্ণনা করতে দেখে ব্রাহ্মণ বড়ই আশ্চার্যান্বিত হলেন। তিনি রাক্ষসীকে বললেন- কোন কর্মের ফলে তুমি এই দশাপ্রাপ্ত হয়েছ ? কোথা থেকে এসেছ ? তোমার নাম কী ? তোমার আচার আচরণই বা কেমন ছিল ? আমাকে বলো।
সেই শাপমুক্ত রাক্ষসী বলল- হে ব্রাহ্মণ, আমার পূর্বজন্মের কথা শ্রবণ করুন। সৌরাষ্ট নগরে ভিক্ষা নামে এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। আমি ছিলাম তাঁর পত্নী। আমার নাম ছিল কলহা। আমি খুবই ভয়ংকর স্বভাবের স্ত্রীলোক ছিলাম। আমি কথাবার্তাতেও কখনো নিজ পতিকে যথার্থ মর্যাদা দান করিনি। তার জন্য কখনো ভালো খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করিনি। আমি সর্বদাই তার আজ্ঞা অমান্য করতাম। আমি অত্যন্ত কলহপ্রিয় ছিলাম। আমার স্বামী ঐ ব্রাহ্মণ আমাকে নিয়ে সর্বদাই উদ্বিগ্ন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমার পতি দ্বিতীয় বিবাহ করবে বলে স্থির করলেন। তখন আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করি। তারপর যমদূতেরা এসে আমাকে বেঁধে পেটাতে পেটাতে যমলোকে নিয়ে গেল। যমরাজ আমাকে উপস্থিত দেখে চিত্রগুপ্তকে জিজ্ঞেস করলেন- চিত্রগুপ্ত, খাতা খুলে দেখ কি কিরূপ কর্ম করেছে। এর কর্মফল শুভ নাকি অশুভ ?
চিত্রগুপ্ত বললেন- ধর্মরাজ, এই পাপীয়সী কোনোরকম শুভ কর্ম করেনি, বরং নিজে ভালো ভালা ভোজন করত, কিন্তু তার পতিকে কোনোকিছু দিত না। এখন একে বল্গুলী (বাদুর) যোনিতে জন্মগ্রহণ করে নিজ বিষ্ঠা ভক্ষণ করে জীবন ধারণ করতে হবে। এই স্ত্রীলোকটি সর্বদা তার স্বামীকে দোষ দিত এবং কলহপরায়ণতা ছিল এর প্রবৃত্তি। সেজন্য তাকে পরের জন্মে শুকর যোনিতে জন্মগহণ করে দিন কাটাতে হবে। সে যে পাত্রে রান্না করত, সেই পাত্রেই ভোজন করত। সেই দোষের জন্য তার পরের জন্মে আপন সন্তান ভক্ষণকারী বিড়ালরূপে জন্মগ্রহণ করবে। তাছাড়া আপন স্বামীর জন্য এ আত্মহত্যা করেছে, সেজন্য এই অত্যন্ত নিন্দনীয় স্ত্রীলোকটিকে এখন থেকে কিছুকাল প্রেত শরীরে অবস্থান করতে হবে। দূতদের দিয়ে একে মরুপ্রদেশে পাঠানো দরকার যেখানে সে প্রেত শরীর ধারণ করে থাকবে। এরপর ঐ পাপিষ্ঠা উক্ত তিন যোনিতে কষ্ট ভোগ করবে।
রাক্ষসী বলে চলল- বিপ্রবর, আমিই সেই পাপিষ্ঠা কলহা, প্রেতশরীরে আমার পাঁচশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। আমি সর্বদাই নিজ কৃতকর্মের জন্য দুঃখিত হয়ে ক্ষুৎ-পিপাসায় অত্যন্ত পীড়িত হয়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছি। একদিন ক্ষুধায় কাতর হয়ে এক বণিকের শরীরে প্রবেশ করি এবং তার সাথে দক্ষিণ দেশে কৃষ্ণা এবং বেণীর সঙ্গমস্থলে উপস্থিত হই। সেখানে আসার পর যখন ঐ সঙ্গমের কিনরায় দাঁড়িয়েছি তখন শিব এবং বিষ্ণুর পার্ষদগণ তার শরীর থেকে বেড়িয়ে আমাকে বলপূর্বক সেখান থেকে বিতাড়িত করে দিল। তখন থেকেই আমি ক্ষুধায় কষ্ট পেতে পেতে এদিক ওদিক ভ্রমন করছি। ঠিক এই সময়েই আপনার ওপরে আমার দৃষ্টি পড়ে। আজ আপনার হাত থেকে তুলসী মিশ্রিত জলের স্পর্শে আমার সমস্ত পাপ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বিপ্রবর আমাকে কৃপা করুন এবং আমাকে বলুন আমি এই প্রেতশরীর এবং আসন্ন ভয়ংকর তিন যোনিতে জন্মগ্রহণের যন্ত্রণা থেকে কীভাবে মুক্ত হব ?
নারদ মুনি বললেন- কলহার এই সমস্ত কথা শুনে দ্বিজশ্রেষ্ঠ ধর্মদত্ত তার কর্মের পরিণাম বিচার করে বড় আশ্চর্যান্বিত এবং দুঃখিত হলেন। অনেক ভাবনাচিন্তার পরে আক্ষেপের সঙ্গে বললেন- তীর্থ, দান এবং ব্রত আদি শুভকর্মের দ্বারা পাপ নষ্ট হয় কিন্তু তুমি এখন প্রেত শরীরে অবস্থান করছ বিধায় এই সমস্ত শুভ কর্মে তোমার অধিকার নেই। তবুও তোমার এই দুর্দশা দেখে আমার মনে অত্যন্ত দুঃখ হচ্ছে। তাই, মনুষ্যজন্ম নিয়ে এখন পর্যন্ত কার্তিক ব্রত পালন করে আমি যে পুণ্য সঞ্চয় করেছি, তার অর্ধেক তোমাকে দান করলাম। সেই অর্ধেক পুণ্য নিয়ে তুমি উত্তম গনি প্রাপ্ত হও।
এই কথা বলে ধর্মদত্ত কলহার শরীরে তুলসী মিশ্রিত জল পুনরায় নিক্ষেপ করলেন এবং দ্বাদশাক্ষর মন্ত্র শোনালেন। অমনি সেই রাক্ষসী প্রেত শরীর পরিত্যাগ করে দিব্যরূপময়ী এক দেবীতে পরিণত হলো। তাকে অগ্নির সমান উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। সে এমনই অনুপম সৌন্দর্য লাভ করল যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মীদেবী। তারপর সে ভূমিতে মস্তক নত করে সেই ধর্মদত্ত ব্রাহ্মণকে প্রণাম করে গদগদ কণ্ঠে বলতে লাগল- দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আপনার কৃপায় আমি নরক যন্ত্রণা থেকে উদ্ধার পেয়েছি। আমি পাপের সমুদ্রে ডুবে ছিলাম। আপনি আমাকে উদ্ধার করলেন। আপনি আমার প্রণাম গ্রহণ করুন।
এইভাবে ব্রাহ্মণের সঙ্গে কথোপকথনের সময় হঠাৎ আকাশ থেকে দিব্যবিমানে করে শ্রীবিষ্ণুর মতো রূপধারী বিষ্ণুপার্ষদগণ অবতরণ করলেন। কাছে এসে বিমানের দ্বারদেশে অবস্থানকারী পুণ্যশীল এবং সুশীল নামে দুই বিষ্ণুদূত রাক্ষসী থেকে রূপান্তরিত সেই দেবীকে বিমানে ওঠালেন। ঐ সময় এরকম বিমান দেখে ধর্মদত্ত বড়ই আশ্চর্যান্বিত হলেন। তিনি বিষ্ণুদূতদের দর্শন করে তাঁদের সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। পুণ্যশীল এবং সুশীল বিষ্ণুদূতদ্বয় ধর্মদত্তের প্রশংসা করে ধর্মতত্ত্ব আলোচনা করতে লাগলেন।
বিষ্ণুদূতদ্বয় বললেন- দ্বিজশ্রেষ্ঠ, তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ। কারণ তুমি সর্বদাই বিষ্ণু আরাধনায় যুক্ত। দীন-দুঃখীদের দয়া করা তোমার স্বভাব। তুমি অত্যন্ত ধর্মাত্মা এবং শ্রীবিষ্ণুব্রত অনুষ্ঠান আদি পালনে নিষ্ঠাযুক্ত। তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে আজ পর্যন্ত এই কল্যাণময় কার্তিক ব্রত পালন করেছ এবং তার অর্ধেক দান করার ফলে দ্বিগুণ পুণ্য লাভে সক্ষম হয়েছ। তুমি অত্যন্ত দয়ালু, তোমার কার্তিক ব্রত এবং তুলসীপূজন আদি শুভকর্মের ফল দান করার ফলে এই স্ত্রীলোকটি আজ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর নিকট গমন করছে। তুমিও দেহাবসানে তোমার দুই পত্নীকে সঙ্গে নিয়ে ভগবান বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠধামে যাবে এবং তাঁর সারূপ্য লাভ করে সর্বদাই তাঁর (ভগবানের) কাছে বাস করবে। পরবর্তী জন্মে তুমি সূর্যবংশীল রাজা দশরথ হবে এবং ঐ দুইপত্নীসহ কলহাও তোমার পত্নী হবে। ভগবান শ্রীবিষ্ণু তোমার পুত্ররূপে অবতীর্ণ হয়ে দেবতাদের কার্যসাধন করবেন। ধর্মদত্ত, যে ব্যক্তি তোমার মতো নিষ্ঠার সঙ্গে ভক্তিভরে শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা করবে, সে ধন্য এবং কৃতকৃত্য তথা এই সংসারে তার জন্মলাভ সার্থক। যিনি পূর্বকালে রাজা উত্তানপাদের পুত্র ধ্রুবকে ‘ধ্রুবপদ’ প্রদান করেছিলেন, সেই শ্রীবিষ্ণুকে যদি কেউ নিষ্ঠা সহকারে আরাধনা করে তাহলে সেই প্রাণীকে কেন তিনি কিছু প্রদান করবেন না?
This clarifies a lot of my confusion on the topic.