শ্রীল সনাতন গোস্বামীর মতে দামবন্ধন লীলাটি সংঘটিত হয়েছিল দীপাবলি উতসবের দিনে। তখন কৃষ্ণের বয়স ছিল ন্যুনাধিক তিন বছর চার মাস। শ্রীকৃষ্ণ তখন গোকুল মহাবনে ছিলেন। শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তীপাদের মতে শ্রীকৃষ্ণ গোকুলে ছিলেন তিন বছর চার মাস। তারপর নন্দবাবা বৃন্দাবনে যমুনার পশ্চিম তীরে ছটিকরাতে চলে যান। সেখানে আরো তিন বছর চার মাস থাকার পর কাম্যবন এবং পরিশেষে নন্দগ্রামে অবস্থান করেন। একদিন মাতা যশোদা চিন্তা করেছিলেন, কৃষ্ণ কেন অন্যান্য গোপীদের দধি নবনীত ইত্যাদি চুরি করছে। নিশ্চয়ই তাঁর ঘরের তৈরি মাখন সুস্বাদু লাগছে না। হয়তো দাসীরা ভালোভাবে দধি মন্থন করছে না। এজন্য কৃষ্ণের মধ্যে ভয়ংকর চৌর্যবৃত্তি দেখা দিয়েছে। আমি যদি সুস্বাদু ননী তৈরী করি, তাহলে গোপাল আর অন্যের বাড়িতে ননী চুরি করতে যাবে না। এখানে যশোদা নামের অর্থটি খুবই প্রাসঙ্গিক। যশোদা- যিনি যশ দান করেন। মা যশোদাই কৃষ্ণকে ভক্তবশ্যতার যশ প্রদান করেছেন। তাই মহীয়সী যশোদা মাতা ঠিক করলেন, তিনি আজ নিজেই দধি মন্থন করবেন।
পিতা নন্দ মহারাজের নবলক্ষ গাভী ছিল। তার মধ্যে সাত-আটটি গাভী ছিল দুষ্প্রাপ্য পদ্মগান্ধিনী গাভী। তাদের বিশেষ প্রকারের ঔষধি ও সুগন্ধি তৃণগুল্মাদি খাওয়ানো হতো। যশোদা মাতা ভাবলেন, এই গাভীদের দুধ থেকে অত্যন্ত উন্নতমানের সুস্বাদু মাখন বানানো যাবে। কৃষ্ণ তখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। তাঁর জেগে ওঠার আগেই দধিমন্থন করতে হবে। তাই মা যশোদা গৃহপরিচারিকাদের অন্যান্য কর্মে নিযুক্ত করে ব্রাহ্মমুহূর্তে দধি মন্থন করতে বসলেন। তিনি আপন মনে দধি মন্থন করার সময় ইতোমধ্যে সংঘটিত বিভিন্ন কৃষ্ণলীলা মৃদুস্বরে গাইতে লাগলেন।
শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, যাঁরা চব্বিশ ঘন্টা কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত থাকতে চান, তাঁদের পক্ষেেএই অভ্যাসটি আয়ত্ত করা আবশ্যই কর্তব্য। কায়, মন ও বাক্য দ্বারাই সেবা করতে হয়। শ্রীমন্মহাপ্রভুও তাই বলেছেন- কি শয়নে, কি ভোজনে কিবা জাগরণে। অহর্নিশি চিন্ত কৃষ্ণ, বলহ বদনে। (চৈ.ভা.ম-২৮/২৮) আমরা সকল কাজ করার সময় মনে মনে- হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী যশোদা মাতার রূপ ও গুণ বর্ণনা করেছেন। মাতা যশোমতি তখন হলুদ রঙের রেশমী কাপড় পরিধান করেছিলেন। এটি অতি পবিত্র কাডড়। দধিমন্থন কার্যে যেন কোনো অপবিত্র প্রভাব না পড়ে সে জন্যই এ আয়োজন। খুব ভোরেই মা এই কাজটি শুরু করেছিলেন, যেন কৃষ্ণের নিদ্রাভঙ্গের আগেই মাখন তোলা যায়। তবুও দধি মন্থনজনিত পরিশ্রমের কারণে তিনি ঘর্মাক্ত ছিলেন। তাঁর সর্বাঙ্গ কম্পিত হচ্ছিল। মাথার ফুলেরর মালাটি ইতস্তুত বিক্ষিপ্ত হয়ে খসে পড়ছিল। এই দৃশ্য সম্পর্কে আচার্যগণ বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। কঙ্কন ও কুণ্ডল যেন নৃত্যচ্ছলে মাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। যে হাত ভগবানের সেবায় ব্যস্ত, আমরা সেই হাতে থেকে ধন্য- একথা বোঝাতে হাতের কঙ্কনদ্বয় ঝনঝন শব্দ করছে। কানের কুণ্ডলগুলো যেন নেচে নেচে সূচিত করছে যে, মায়ের মুখে ভগবানের লীলাগান শুনে কান তার উতপত্তির সার্থকতা লাভ করেছে। আর মস্তকের কবরীস্থিত মালতি পুষ্প খসে পড়ার মাধ্যমে বোজাচ্ছে, হায় ! হায়! বাতসল্য প্রেমের মূর্তিমতী মাতা যশোদার মস্তকে থাকার ঔদ্ধত্য কি আমাদের সাজে, তাঁর চরণ পেলেই ধন্য হব আমরা। চিন্ময় জগতে সবকিছুই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তাই সবকিছুর পৃথক পৃথক অভিব্যক্তি রয়েছে।
এদিকে মাতার হৃদয়ের স্নেহই স্তনদুগ্ধরূপে বহির্গত হচ্ছে। কেননা একবার সুস্বাদু নবনীত দেখে, কৃষ্ণ যদি স্তন্যপান না করে- এই ভয়ে কৃষ্ণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আপনা থেকেই দুগ্ধ নিঃসরিত হচ্ছে। আবার, কঙ্কনের ঝনঝন শব্দ আর দধি মন্থনের ঘর ঘর শব্দ করতাল ও মৃদঙ্গ যেন বাদ্যরূপে মায়ের মুখের কৃষ্ণলীলা গানে সহায়তা করছে। একারণেই আমরাও ভগবানের বিভিন্ন সেবা করে আনন্দ লাভ করি। কেননা, ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ইন্দ্রিয়াধিপতির সেবা করলেই ইন্দ্রিয়ের প্রকৃত তৃপ্তি লাভ করা যায়।
No Comment! Be the first one.