এদিকে কৃষ্ণ ঘরের ভিতরে ঘুমিয়েছিলেন। সারারাত ঘুমিয়ে কৃষ্ণ স্বাভাবিকভাবেই খুব ক্ষুধার্ত থাকেন। তাই প্রতিদিন তাঁর ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে মা তাঁকে স্নপান করান। তাই আজও কৃষ্ণ ঘুম থেকে ওঠামাত্রই ক্ষুধার্ত হয়ে মাকে খোজ করছিলেন। তখন মায়ের কণ্ঠে মৃদুস্বরে গান শ্রবণ করে ভাবলেন, “আজ কী হলো ! মা আমাকে রেখেই বিছানা থেকে উঠে পড়েছে। আমার জন্য কি তার কোন দুশ্চিন্তা নেই?” তাই, তিনি তাঁর দুই পদ্মহস্ত দ্বারা নেত্রযুগল মার্জনা করতে করতে সেই দধি মন্থন স্থানে এলেন।
মা যশোমতির কী প্রগাঢ় সেবানিষ্ঠা। ব্রহ্মা, শিব ও মহান যোগীরা বহুকাল ধ্যান করেও সহজে যাঁকে পান না, সেই কৃষ্ণ এসে মায়ের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, অথচ তার কোনো খেয়ালই নেই। কৃষ্ণ ভাবলেন, আমার কিছু করা দরকার। তাই সরাসরি মন্থন দণ্ড চেপে ধরলেন। কেননা এই মন্থনদণ্ডই মাকে ব্যস্ত রেখেছে। তাছাড়া জ্ঞানীরা অগাধ শাস্ত্ররাজি মন্থন করে পরিশেষে কৃষ্ণকেই পায়। আর কৃষ্ণ এখানে সাক্ষাত দণ্ডায়মান। তাই মন্থনকার্য থামানোর মাধ্যমে কৃষ্ণ যেন যশোদা মায়ের সাধনার পূর্ণতার ইঙ্গিত ছিচ্ছেন।
মা যশোমতি কৃষ্ণকে বললেন- একটু সবুর কর বাছা; অল্প একটু মাখন তুলে নিই। না, আমি এখুনি দুধ খাব- এই বলে কৃষ্ণ জোর করে মায়ের কোমরে জাপটা ধরে, জানুর উপর পা দিয়ে কোলে উঠে পড়লেন। আর স্নন থেকে স্বতঃনিঃসরিত দুগ্ধধারা আস্বাদনে মনোযোগ দিলেন। মা তখন কৃষ্ণের নয়নাভিরাম সুমধুর মুখপানে তাকিয়ে রইলেন কিন্তু সামনেই বৃহত চুল্লীর উপরে পদ্মগন্ধা গাভীর দুধ গরম করা হচ্ছিল। এই গোদুগ্ধ মায়ের স্বনদুগ্ধের কৃষ্ণসেবা প্রাপ্তির সার্থকতা দেখে ভাবতে লাগল, হায় ! স্নেহময়ী মা যশোদার দুগ্ধতা কখনো ফুরাবে না, আর প্রেমবুভুক্ষু শ্রীকৃষ্ণের তৃষ্ণাও তো মিটবে না। তবে আমার কী হবে ? যুগ যুখ ধরে সেই অধর স্পর্শ লাভের তপস্যা করছি, পেট ভরে গেলে তো কৃষ্ণ আমার দিকে ফিরেও তাকাবে না। আমি যদি কৃষ্ণের সেবায় ব্যবহৃত না হই, তবে আমার বেঁচে থেকে কী লাভ ! বরং তাঁর সামনেই অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন করি। এই বলে অগ্নিতাপে স্ফীতা দুগ্ধ পাত্রের গা বেয়ে উপচে পড়তে লাগলো। মা হঠাত তা খেয়াল করলেন। ততক্ষণাত দুধ নামানোর জন্য অতৃপ্ত কৃষ্ণকে কোল থেকে নামিয়ে মেঝেতে রেখে দৌড়ে চুলার দিকে যেতে লাগলেন।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, মা যশোদার স্নেহ কী রকম ? মনে হয়, কৃষ্ণের চেয়ে দুধের প্রতিই তাঁর মমতা অধিক। নতুবা তিনি কেন অতৃপ্ত কৃষ্ণকে ফেলে চলে গেলেন ? এর উত্তর হচ্ছে – প্রেমী ভক্তের কাছে ভগবান অপেক্ষা ভগবানের সেবাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মা যশোদার ভাব- আমরা স্তনদুগ্ধ তো কৃষ্ণ পরেও খেতে পারবে কিন্তু এই পদ্মিনী গাভীর উপাদেয় ও সুস্বাদু বিশেষ দুগ্ধ নষ্ট হয়ে গেলে কৃষ্ণ তা থেকে বঞ্চিত হবে। তাছাড়া, একটু পরেই কৃষ্ণ এসে যদি বলে- “আমাকে ননী-মাখন, ছানা দাও”। তখন তা না পেলে কৃষ্ণ হয়ত আবার কারো ঘরে ননীচুরি করতে যাবে। এই ভয়ে দুগ্ধ রক্ষার প্রতি মায়ের এত মনোযোগ। এদিকে দুধ ভাবল- হায়! আমার মতো পাপিষ্ঠ আর কোথাও নেই। আমার জন্য আজ যশোদা মাতা ও কৃষ্ণের প্রেম আদান প্রদান ব্যাহত হলো। তাই সেও শান্ত হয়ে পড়ল।
এভাবে তাঁকে ফেলে চলে যাওয়ার ফলে মায়ের ওপর কৃষ্ণের ভীষণ রাগ হলো। এখানে লক্ষনীয় বিষয়, যদিও ভগবান ‘আত্মারাম’ ও ‘আপ্তকাম’, তবে তিনি ক্রদ্ধ হলেন কেন? হয়ত মা যশোদার প্রীতিবন্ধনে তিনি যে কতটুকু আবিষ্ট তা একটু পরেই প্রমাণ করবেন সেজন্য। ক্রোধবশন, তাঁর অরুণবর্ণ ঠোঁটে সাদা দুধের দাঁত দিয়ে তিনি কামড় দিচ্ছেলেন আর ভাবছিলেন- “মা তুমি এত কৃপণ, আজ দুই-ই তোমার কাছে বড় হয়ে দাঁড়ালো। আমি কত ক্ষুধার্ত, আমার জন্য তোমার কোন চিন্তাই নেই। সামান্য দুধের জন্য এমন করতে পারলে। ঠিক আছে, দেখাচ্ছি মজা। এই বলে অশ্রু মোচন করতে করতে নিকটস্থ পেষণী (মশলা বাটায় ব্যবহৃত- নোড়া) দিয়ে দধিভাণ্ডটি ভেঙে ফেললেন। দধিভাণ্ডটিও আবার তলদেশ দিয়ে ভাঙলেন, যেন খুব বেশি শব্দ না হয়। এরপর সদ্যোজাত নবনীত খেতে খেতে পাশের ঘরে চলে যেতে লাগলেন। আর ভাবছেন- যেহেতু আমাকে তোমার কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছ, তাই আমি কোনো খল ব্যক্তির কাছে চলে যাব। তখন কৃষ্ণ রেগে গিয়ে সেখানে উল্টোভাবে রাখা উদূখলের উপর বসলেন। মায়ের কোলে বসতে না পেরে উদূখলে বসেছেন। এরপর প্রচণ্ড ক্রোধে শিকায় রাখা সমস্ত মাখন বানরদের বিতরণ করতে লাগলেন। আবার, মা আসে কি না ভেবে, চুরি করার দায়ে ভীত সম্ভ্রস্ত হয়ে শঙ্কিত নেত্রে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। বৈষ্ণব আচার্যগণের ভাব- হয়তো রাম অবতারের কথা স্মরণ হয়েছে, তখন কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই বানরদের কাজে লাগানো হয়েছে। তাই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এদের কিছু দেওয়া উচিত। আবার, এ-ও হতে পারে যে, ক্রোধবশত দধিভাণ্ড ভাঙার অপরাধের প্রায়শ্চিত্তই এ দানব্রত।
No Comment! Be the first one.