মা যশোদা চুলা থেকে দুধ নামিয়ে রেখে দধি মন্থন স্থানে ফিরে এসে দেখলেন দধিভান্ড ভগ্ন হয়েছে এবং সেখানে কৃষ্ণকে না দেখতে পেয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবেই পেরেছিলেন তা কৃষ্ণরেই কার্য । এরপর মেঝেতে পড়ে থাকা দধির মধ্যে ছোট ছোট পায়ের ছাপ দেখতে পেয়ে তিনি হাসলেন । একটি ছোট ছড়ি নিয়ে পেছন দিক থেকে লুকিয়ে, আস্তে আস্তে কৃষ্ণের পেছনে গিয়ে দাড়াঁলেন।
মা ছড়ি হাতে দাঁড়িয়ে আছে দেখে কৃষ্ণ অত্যন্ত ভীত হলেন এবং তৎক্ষনাৎ উদূখল থেকে লাফিয়ে নেমে দ্রুত বেগে ছুটতে লাগলেন। যোগীরা মনের গতিতে যার দিকে ধাবিত হয়েও তাকে প্রাপ্ত হয় না, তাঁকে ধরার জন্য মা যশোদা ছড়ি হাতে পশ্চাদ্ধাবন করছেন । কৃষ্ণ জানতেন যে, আজ মা যদি তাঁকে ধরতে পারে, তবে আর রক্ষা নেই। কেননা আজ অনেকগুলো দুষ্কর্ম করা হয়েছে। বৈষ্ণব আচার্যগন বলেন, এই লীলায় শ্রীকৃষ্ণ এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে , তিনি ভয়ের অভিনয়ের পরিবর্তে মা যশোদার বাৎসল্য প্রেমের বশীভূত হয়ে সত্যিই ভয় পেয়েছিলেন । তাই , সর্বগ্রাসী কাল যার ভয়ে ভীত, সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আজ ভীত শঙ্কিত হয়ে পলায়ন মা যশোদার পক্ষে ও দ্রুত দৌড়ানোর সম্ভব ছিল না । তাঁর শরীর ও বেশভূষা দুই …ই যেন তার সংগে বিরোধিতা করছিল কেন তুমি আজ কানাইকে তাড়া করছ? কিন্তু মা তো ছাড়ার পাত্রী না । তিনি আজ কানাইকে দন্ড দেবেনই । তাই মা যশোদা সর্ব্শক্তি দিয়ে কৃষ্ণের পেছনে দৌড়াতে লাগলেন। প্রথমে ঘরের ভেতরে দৌড়াদৌড়ি হচ্ছিল । পরে কৃষ্ণ গোকুলের রাস্তায় চলে এলেন । এদিকে ব্রজবাসীরা এই দৌড় প্রতিযোগিতা দেখছিলেন ।
দুরন্ত কৃষ্ণ এদিক – সেদিক দৌড়াতে লাগলেন । কিন্তু নিতম্বভারে যশোদাদেবীর গতি মন্থর হলো । ঘর্মক্তি কলেবর অবস্থায় মাথার কবরী খুলে গেল । কৃষ্ণ পেছনে দিকে তাকিয়ে দেখতে চাইলেন মা কত দূর । অমনি মা যশোদা খপ করে কৃষ্ণের ডান হাত ধরে ফেললেন ।
মায়ের হাতে ধরা পড়ে শাস্তির ভয়ে কৃষ্ণ কান্না করতে লাগলেন। তিনি বাঁ হাতে তাঁর নয়নপদ্মযুগলের অশ্রুমোচন করছিলেন। এতে চোখের কাজল সারা মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বারবার ভীতশঙ্কিত নেত্রে মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। মা তখন লাঠির ভয় দেখিয়ে বলতে লাগলেন- “রে দুষ্ট, বানরবন্ধু, দধিভাণ্ড ভগ্নকারী। এখন ননীমাখন কোথায় পাবে ? আজ এমনভাবে বেঁধে যেন বন্ধুদের সাথে খেলতে না পার। এখন কেন ভয় পাচ্ছ ?”
পুত্রের মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষীরূপে তিনি জানতেন যে, এইটুকু শিশুকে এতটা ভয় দেখানো ঠিক হবে না। অথচ তাঁকে একটু দণ্ড না দিলেও নয়। তাই, তাহের ছড়িটা ফেলে দিয়ে তাঁকে বেঁধে রাখতে মনস্থ করলেন। কেননা, ভয় পেয়ে আবার কোথায় পালিয়ে যায়, তার ঠিক নেই। তাই, যাঁর ভেতর-বাহির নেই, আদি-অন্ত নেই; যিনি জগতের পূর্বেও ছিলেন পরেও থাকবেন; যিনি জগতের ভেতরেও আছেন, বাইরেও আছেন, আবার জগৎরূপেও বর্তমান; শুধু তাই নয়, যিনি ইন্দ্রিয়ের অতীত, অব্যক্ত সেই পরম পুরুষ ভগবান মনুষ্যরূপে লীলা করায় মা তাঁকে স্বীয়পুত্র মনে করে উদূখলের সাথে বেঁধে রাখলেন। উদূখলের সাথে বাঁধার কারণ, যে ব্যক্তি চুরিতে সহায়তা করে সেও চোর। যেহেতু উদূখল কৃষ্ণের চুরিতে সহায়তা করেছে, তাই উদূখল ও কৃষ্ণ-এ দুই চোরকে একসাথে বাঁধলেন।
মা যশোদা যখন অপরাধী বালকটিকে বাঁধার চেষ্টা করছিলেন, তখন দু-আঙৃুল দড়ি কম পড়ল। কেননা, ভগবানের কৃপাদৃষ্টি যাঁর ওপর পড়ে তিনি বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যান। সেই মুক্তি দাতা মুকুন্দের আবার বন্ধন হবে কী করে ? আবার, গো-বন্ধনকারী (ইন্দ্রিয়সমূহ বন্ধনকারী) দড়ি আবার গো-পতিকে (ইন্দ্রিয়াধীশকে) বন্ধন করবে কী করে? তবে কেন মাত্র দু-আঙুল কম পড়ল, এ বিষয়ে আচার্যগণ বলেন- ভক্তের পূর্ণ প্রচেষ্টা এবং ভগবানের করুণার অপূর্ণতাই এর কারণ।
তাই, তিনি তখন সেই দড়িটির সাথে আরেকটি দড়ি যুক্ত করলেন। কিন্তু তবুও দু-আঙুল কম পড়ল। এভাব, েযত দড়ি যোগ করা হয়, তবুও দু-আঙুল কম পড়ে। এভাবে নিজগৃহের সমস্ত দড়ি ফুরিয়ে গেলে, অন্য ব্রজবাসীদের গৃহ থেকে দড়ি আনার পরেও একই অবস্থা। এতে গোপীরা হাসতে শুরু করল, আর যশোদাও হাসতে হাসতে বিস্ময়াপন্ন হলেন। কেননা, যাঁর কোমর মাত্র এক মুষ্টি, কিন্তু একশ হাত দড়িতেও তা বাঁধা পড়ছে না। তখন গোপীরা বলল- দেখ যশোদা, ওর কোমরে ছোট্ট সুতোয় বাঁধা কিঙ্কিনি কেমন রুনুঝুনু বাজছে। আর এত দড়ি দিয়েও তুমি তাঁকে বাঁধনে পারছ না। হয়তো, এর কপালে আজ বন্ধন নেই। যশোদা বললেন- আজ যদি সন্ধ্যাও হয়ে যায়, গ্রামের সমস্ত দড়িও প্রয়োজন হয়, তবুও একে ছাড়ব না। ভগবান যখন ভক্তের চেষ্টা দেখেন, তখন তিনি কৃপাপূর্বক বন্ধন স্বীকার করেন। তাই, মা যশোদার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দেখে, ভগবান তাঁর প্রতি করুণাপরায়ণ হলেন।
যিনি স্বীয় মায়ারজ্জুতে নিখিল জগৎ বন্ধন করে রেখেছেন, তিনি আজ মায়ের রজ্জুবন্ধনে আবদ্ধ হলেন। শিব, ব্রহ্মা, ইন্দ্র প্রমুখ মহান দেবতাসহ এই নিখিল বিশ্ব যাঁর বশীভূত, সেই স্বতন্ত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এভাবে তাঁর ভক্তবশ্যতা দেখিয়েছেন। মা যশোদা মুক্তিদাতা শ্রীকৃষ্ণের কাছে যে অনুগ্রহ লাভ করেছেন, তা ব্রহ্মা, মহেশ্বর এমনকি ভগবানের বক্ষ-বিলাসিনী লক্ষ্মীদেবীও প্রাপ্ত হননি। যশোদানন্দন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বতঃস্ফূর্ত প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত ভক্তদের পক্ষে যেমন সুলভ, মনোধর্মী জ্ঞানী, আত্মোপলব্ধিকামী তাপস বা দেহাত্মবুদ্ধি পরায়ণ ব্যক্তির কাছে তেমন সুলভ নন।
ঐদিন মাতা রোহিনী বলরামকে নিয়ে উপানন্দের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলেন। বাড়িতে ফিরে কৃষ্ণকে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেয়ে বলরাম অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন। তিনি হুঙ্কার করতে লাগলেন- কে বেঁধেছে? কার এত বড় সাহস? তখন সামনে গোপবালকদের মধ্যে কেউ মাতা যশোদার নাম বলে দিল। এমন সময় বাইরে হৈচৈ শুনে যশোদা মাতা সেখানে এলেন। বলরামকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন- কী হয়েছে? চেঁচামেচি করছ কেন ? বলরাম বললেন, তুমি জানো কৃষ্ণ কে? এই কৃষ্ণই নারায়ণ, ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণু, বামন, মৎস্য, কুর্ম; এই কৃষ্ণই নৃসিংহরূপে হিরণ্যকশিপুর বক্ষ বিদারণ করেছিল….। যশোদা বললেন- আর তুমি কে? বলরাম বললেন- আমি সংকর্ষণ, আমি শেষনাগ, আমার মাথায় এই সমগ্য ব্রহ্মাণ্ড সর্ষপাকৃতির ন্যায় বিরাজ করে। আমি মুহূর্তেই এই বিশ্ব ধ্বংস করে দিতে পারি। মা যশোদার বাৎসল্য প্রেম এতই প্রবল যে, বলরামের এসকল বাক্যের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ না করেই বললেন- আরে আরে ! সব অবতারই দেখি আমার ঘরে ঢুকে বসে আছে। কেন ? আর কোনো ব্রজবাসীর ঘরে কি জায়গা ছিল না ? আমার ছড়িটা কোথায় ? এখুনি নৃসিংহ আর সংকর্ষণের ভূত পিটিয়ে ছাড়াব। বলরাম তখন ভয় পেয়ে দৌড়ে পালালেন। বাৎসল্য প্রেমের কাছে ভগবানের ঐশ্বর্য আজ পরাভূত হলো।
No Comment! Be the first one.