বলরামকে শাসন করে মা যশোদা তাঁর ছেলেকে এভাবে বেঁধে রেখে গৃহকর্মে বৃস্ত হলেন। এদিকে উদূখলে বাঁধা শ্রীকৃষ্ণ বাড়ির সামনে দুটি অর্জুন বৃক্ষ দেখতে পেলেন। এ দুটি বৃক্ষের একটি ইতিহাস আছে। এরা ধনপতি কুবেরের পুত্র নলকূবর ও মণিগ্রীব। সাক্ষাত শিবের অনুচর হওয়া সত্ত্বেও এদের মাথায় কুবুদ্ধি প্রবেশ করে। একবার তারা বারুণী সুধাপানে উন্মত্ত হয়ে দিগম্বর অবস্থায় জলে নেমে, প্রমত্ত হাতির মতো দেবাঙ্গনাদের সাথে জলক্রীড়া করছিল। তখন নারদ মুনি হরি-গুণগান করতে করতে তসেদিকে আসছিলেন। তা দেখে দেবাঙ্গনারা তাদের স্বীয় বস্ত্র পরিধান করল। কিন্তু সেই পাষণ্ডদ্বয় নারদ মুনির মতো মহান বৈষ্ণবকে উপেক্ষা করল। তখন করুণাসিন্ধু নারদ মুনি তাদের দুরাবস্থা দেখে বৃক্ষ যোনি প্রাপ্ত হয়ে চিরকাল নগ্ন থাকার অভিশাপ দিয়েছিলেন। তারাই অর্জুন বৃক্ষরূপে নন্দভবনে জন্মম নিয়েছিল। কৃষ্ণ ভাবলেন- যদিও এরা কুবেরের পুত্র, তবে এতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু যেহেতু নারদ মুনি এদের উদ্ধার করতে মনস্থ করেছেন, তাই এদের উদ্ধার করতে হবে।
ভক্তবশ শ্রীকৃষ্ণ উদূখলে বাঁধা অবস্থায় হামাগুড়ি দিয়ে বৃক্ষ দুটির মাঝখান দিয়ে গেলেন। এতে পেছনে বাঁধা উদূখলটি বক্রভাবে দুটি বৃক্ষে আটকে গেল। তিনি তখন অবলীলায় খেলনা ভাঙা্র মতো গাছ দুটি উপড়ে ফেললেন। সাথে সাথে বৃক্ষ দুটির মধ্য থেকে জ্যোতির্ময় দুই মহাপুরুষ প্রকাশিত হলেন। তাদের সৌন্দর্যের ছটায় সর্বদিক আলোকিত হয়ে পড়ল এবং তারা অবনত মস্তকে শ্রীকৃষ্ণকে প্রণতি জানিয়ে স্তুতি করতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণ তখন বললেন- দেবর্ষি নারদ অত্যন্ত কৃপাময়। ধনমদে অন্ধ, তোমাদের দুজনকে অভিশাপ দিয়ে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর মহত কৃপা প্রদর্শন করেছেন। যদিও তোমরা স্বর্গ থেকে অধঃপতিত হয়ে বৃক্ষ যোনি প্রাপ্ত হয়েছিলে, তবুও তোমরা নারদমুনির কৃপাধন্য। সূর্যের আগমনে যেভাবে চক্ষুর অন্ধকার দূরীভূত হয়, তেমনি ঐকান্তিকভাবে আমরা শরণাগত এবং আমার সেবায় কৃত সংকল্প ভক্তের দর্শনের ফলে, কারো আর জড় বন্ধন থাকতে পারে না। তোমরা এখন গৃহে ফিরে যেতে পার। তোমরা যেহেতু সর্বদা আমার ভক্তিতে মগ্ন হতে চেয়েছিলে, এখন তোমাদের সেই বাসনা পূর্ণ হলো। এ স্তর থেকে তোমাদের কখনো অধঃপতন হবে না।
তখন তারা কৃষ্ণকে প্রদক্ষিণ করে চলে গেলেন। কিন্তু নিকটে ক্রীড়ারত বালকেরা এই বিস্ময়কর ঘটনা দেখছিল। এদিকে প্রচন্ড বজ্রপাতের শব্দে বৃক্ষদ্বয় পড়ে যাওয়াতে নন্দ মহারাজ প্রমুখ গোপগণ কোনো বিপদের আশঙ্কা করে সেখানে এলন। ভূপাতিত বিশাল বৃক্ষ দুটির মাঝে কৃষ্ণকে দেখে সকলেই তাঁর সুরক্ষার ব্যাপারে চিন্তিত হলেন। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় তাঁর গায়ে একটা আঁচরও লাগেনি। নন্দ মহারাজ তাঁর পুত্রকে রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় উদূখল নিয়ে টানাটানি করতে দেখে হাসতে হাসতে তাঁকে বন্ধনমুক্ত করলেন। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ গোপেরা বৃক্ষ দুটির পতিত হওয়ার কারণ নির্ণয় করতে অসমর্থ হলেন। কৃ্ষ্ণতো সেখানে উদূখলে বদ্ধ হয়ে আছে। তবে কে এই কাজটি করল ?
তখন সেই ছোট বালকেরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সবকিছু খুলে বলল। গভীর বাতসল্য প্রেমের ফলে নন্দ মহারাজ প্রমুখ গোপগণ বিশ্বাস করতে পারেননি যে, শ্রীকৃ্ষ্ণ এত আশ্চার্যজনকভাবে বৃক্ষ দুটি উতপাটন করেছিলেন। কিন্তু কেউ কেউ ভাবতে লাগলেন, যেহেতু ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে, কৃষ্ণ নারায়ণের সমতুল্য হবে, তাই সে এই কার্য করেও থাকতে পারে। এই দামবন্ধন ও নলকূবর- মণিগ্রীব উদ্ধার লীলার মাঝেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তবশ্যতা গুণ প্রদর্শন করলেন।
No Comment! Be the first one.