কুবেরে দুই পুত্র যদিও ছিলেন শিবের মহান ভক্ত, তবুও তিনটি কারণে নারদমুনির প্রতি তাদের অপরাধ হয় এবং পরিণামে তারা অধঃপতিত হয়- ১) দম্ভ বা অহংকার, ২) নেশায় আসক্তি, ৩) যৌন সম্ভোগ।
১) দম্ভ বা অহংকারঃ অত্যন্ত সুখদায়ক অনুকূল পরিবেশ সর্বদা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়। আমরা হয়ত অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে তা কৃষ্ণের কৃপা বলে মনে না করে নিজের কৃতিত্ব বলে মনে করতে পারি। কিন্তু এই ঐশ্বর্য হতে উতপন্ন মিথ্যা অহংকার আমাদের পতনের অন্যতম কারণ।
২) নেশায় আসক্তিঃ কেউ যখন নেশায় আসক্ত হয়, তখন তার আর কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। মদিরা পান করে নলকূবর ও মণিগ্রীবেরও একই অবস্থা হয়েছিল।
৩) যৌন সম্ভোগঃ শ্রীসঙ্গ আপাত সুখকর বলে মনে হলেও তা আমাদের ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনে। তাই শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তার গোদ্রুম ভজনোপদেশে বর্ণনা করেছেন- রমণীজন-সঙ্গসুখঞ্চ সখে চরমে ভয়দং পুরুষার্থহরম। রমণীর সঙ্গে যে সুখ লাভ হয় তা চরমে অত্যন্ত ভয়ানক এবং তা আমাদের জীবনের পরম লক্ষ্যকে হরণ করে।
- কুবের পুত্ররা মন্দাকিনীতে (গঙ্গায়) গিয়ে কাম-মোহিত হওয়ার ফলে গঙ্গাস্নান করেও দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাই কে কোথায় আছে তাঁর ওপর তার গন্তব্য নির্ধারিত হয় না, বরং মনোবৃত্তির ওপরই তার গন্তব্য নির্ণীত হয়। সুতরাং, গঙ্গাস্নান করতে গিয়েও যদি কারো মনোবৃত্তি শুদ্ধ না থাকে, তবে পাপ মুক্তি না হয়ে বরং আরো অপরাধ হয়, যা ভগবদ্ভক্তি লাভের প্রতিবন্ধক।
- ভগবানের শুদ্ধভক্ত বা সদগুরুর কৃপালাভ অত্যন্ত দুর্লভ। সাধুর কৃপাতেই ভগবানের কৃপা লাভ হয়। কিন্তু তাঁর প্রতি অপরাধের ফলে অবশ্যই দণ্ড পেতে হয়।
- দেহের সৌন্দর্য, উচ্চকুলে জন্ম এবং বিদ্যা প্রভৃতি উপভোগ্যের বিষয় তথা মদের মধ্যে ঐশ্বর্য বা ধনমদ সবচেয়ে ক্ষতিকর। কারণ, ধনমদে মত্ত মানুষ অজ্ঞতার ফলে তাদের ধনসম্পদ দ্বারা স্ত্রীসম্ভোগ, দ্যুতক্রীড়া এবং মদ্যপানে লিপ্ত হওয়ার অধিক সুযোগ প্রাপ্ত হয়।
- ঐশ্বর্যের চারটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে- ১. ইন্দ্রিয়সমূহকে বিক্ষিপ্ত করে ২. অহংকারী করে তোলে ৩. নিষ্ঠুরতা বাড়ায় এবং ৪. হাতে অর্থ থাকার ফলে সহজে জড় বাসনা চরিতার্থ করতে উদ্ধুদ্ধ করে।
- ইন্দ্রিয় তর্পণের জন্য নগ্ন থাকার ফলে বৃক্ষ জন্ম লাভ করতে হয়।
- ভক্তের অভিশাপও কৃপায় পর্যবসিত হয়। ধরুন, কোনো সন্তান ঘুমিয়ে আছে। এদিকে তার একটা রোগ সারানোর জন্য ওষুধ খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। তখন বাবা চিমটি কেটে সন্তানকে ঘুম থেকে তুলে ওষুধ খাওয়ায়। ঠিক তেমনি এখানে নারদমুনি নলকূবর ও মণিগ্রীবের জড় অন্ধত্ব দূর করার জন্য অভিশপ্ত করার মাধ্যমে তাদের আশীর্বাদ দিলেন। তিনি তাদের বৃক্ষযোনি প্রাপ্ত হওয়ার অভিশাপ দিলেন যাতে তারা আর পুনরায় এধরনের কোনো পাপ কার্যে লিপ্ত হতে না পারে এবং পরে ভগবানের কৃপায় বৃক্ষশরীর থেকে মুক্ত হতে পারে।
- নারদমুনির হৃদয়ে অত্যন্ত করুণা ছিল, তাই তিনি অভিশাপ দিতে পেরেছিলেন। কারণ তিনি তাদের প্রকৃতই কল্যাণ চেয়েছিলেন। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য ক্রোধবশত কখনো কাউকে অভিশাপ দেয়া বা কারো নিন্দা করা উচিত নয়। অবশ্যই অধিকার বুঝে নিন্দা বা সমালোচনা করা উচিত। যদি কেউ কল্যাণের উদ্দেশ্য চিন্তা না করেই সমালোচনা করে, তবে তা তার ধ্বংসের কারণ; যেমনটা হয়েছিল শিশুপালের ক্ষেত্রে।
- জন্ম, ঐশ্বর্য, শ্রুত, শ্রী- কোনোটিই ভগবানকে সাক্ষাত দর্শন দান করতে পারে না। ভক্তের করুণার ফলেই কেবল ভগবত-দর্শন সম্ভব।
- যদি কেউ সরাসরি ভগবানের কাছে না গিয়ে ভক্তের মাধ্যমে ভগবানের কাছে যাওয়ার প্রয়াস করে, তবে সে শ্রীঘ্রই সফল হবে। কারণ, ভগবানকে লাভ করার একমাত্র পন্থা ভক্তি। কিন্তু, ভগবান স্বয়ং সে ভক্তি দান করেন না। তিনি তাঁর ভক্তের দ্বারাই সে ভক্তি দান করেন।
- শ্রীমদ্ভাগবতে (১/২/১৬) বলা হয়েছে- স্যান্মহতসেবায় বিপ্রা পুণ্যতীর্থনিষেবণাত। অর্থাত সব রকমের পাপ থেকে মৃক্ত ভগবদ্ভক্তদের সেবা করার ফলেই কেবল মহতসেবা সাধিত হয়। আবার, শ্রীমদ্ভাগবতে (৫/১২/১২) জড় ভরত মহারাজ রহূগণকে বলেছেন- মহাজনের শ্রীপাদপদ্মের ধূলিকণার দ্বারা অভিষিক্ত না হলে তপস্যা, বৈদিক অর্চনাদি, সন্ন্যাস পালন, গার্হস্থ্য-ধর্ম পালন, বেদপাঠ অথবা জল-অগ্নি-সূর্যের পূজা দ্বারা কখনোই ভক্তি লাভ করা যায় না।
- ভগবান তাঁর অনন্তস্বরূপে অনন্তলীলার মাধ্যমে তাঁর ভক্তকে আনন্দ প্রদান করেন। আমাদের উচিত, ভগবানের এ সকল অমৃতময় লীলা শ্রবণের মাধ্যমে আবার আমাদের চিন্ময় স্বরূপে ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রয়াসী হওয়া।
No Comment! Be the first one.