পরমেশ্বর ভগবান অজ, অর্থাত তাঁর জন্ম নেই। তাই নিরাকারবাদীরা বলে থাকেন, যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছে, তাই তিনি ভগবান নন। প্রকৃতপক্ষে, ভগবানের ক্ষেত্রে এই অজ কথাটির তাতপর্য- চিন্ময় জগতে তাঁর কখনো জন্ম হয়নি, যেহেতু তিনি নিত্য বিদ্যমান। এমনকি জড়জগতেও বিভিন্নরূপে অবতরণ কালে তিনি সাধারণ জীবের ন্যায় কর্মফলে আবদ্ধ হয়ে সাধারণ শিশুর মতো জন্মগ্রহণ করেন না, বরং প্রধানমন্ত্রী যেমন কখনো কখনো আসামীদের দেখার জন্য স্বেচ্ছায় কারাগারে যান, তেমনি জগজ্জীবের প্রতি করুণাবশত ভগবান স্বেচ্ছায় এ জগতে আবির্ভূত হন। তাই তাঁর জন্ম ও কর্ম দিব্য। চিজ্জগতে তাঁর নিত্যশুদ্ধ ভক্তগণই পিতামাতারূপে বাতসল্য রসে তাঁর সেবা করেন এবং যেহেতু তিনিই সকলের আদি ও উতস, তাই সেই পিতামাতাও তাঁর থেকেই প্রকাশিত। এজগতে লীলাবিলাসের উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমে সেই ভক্তগণকে প্রেরণ করেন, তারপর জগজ্জীবকে মোহিত করে বাতসল্য রস আস্বাদানের জন্য তিনি তাঁদের পিতামাতারূপে গ্রহণ করেন। ভগব্দগীতার (৪.৬) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন- “যদিও আমি জন্মরহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের ঈশ্বর, তবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার আদি চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।” সুতরাং, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর চিন্ময় স্বরূপেই অবতীর্ণ হন। কিন্তু তিনি তাঁর যোগমায়ার দ্বারা নিজের ভগবত্তাকে আচ্ছন্ন রাখেন, যেন পূর্ণরূপে বিবিধ রস আস্বাদন হয়। কেননা, প্রভুত্ব ভাব থাকলে বন্ধুত্ব, বাৎসল্য বা মাধুর্যের পূর্ণ আস্বাদন সম্ভব নয়। তাই জড়জগতে লীলাবিলাসকালে তিনি কখনো কখনো তাঁর ভগবত্তা প্রকাশ করলেও সাধারণত তিনি জড়াপ্রকৃতির নিয়ম অমান্য করেন না। পরমেশ্বর হওয়া সত্ত্বেও তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তখন সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করেন। আর তখন অত্যন্ত মূঢ় তথা মূর্খরা তাঁকে সাধারণ মানুষ ভেবে অবজ্ঞা করে- অবজানন্তি মাং মূঢ়্য মানুষীং তনুমাশ্রিতম্। (ভ.গী. ৯.১১)। প্রকৃতপক্ষে, ভগবান যেরূপেই লীলাবিলাস করুন না কেন, তিনি সর্বদাই পরমতত্ত্ব পরমেশ্বর ভগবান। শ্রীকৃষ্ণ মহান পরমপুরুষ বলেই সমগ্র পৃথিবীর সম্রাট পরীক্ষিত জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তাঁর লীলাকাহিনী শ্রবণ করতে করতে দেহত্যাগ কেরেছিলেন এবং পরমহংস শ্রীল শুকদেব গোস্বামী তা বর্ণনা করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের লীলাসমূহের মধ্যে অন্যতম মাখনচুরি ও দামবন্ধন লীলা।
যাঁর এক নিঃশ্বাসে তাঁর লোমকূপ থেকে অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়, সেই মহাবিষ্ণু যাঁর অংশের অংশ, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি। অর্থাত কৃষ্ণ অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ডের তথা সবকিছুর মালিক। ফসল উতপাদনের জন্য প্রয়োজন ভূমি, বীজ, সূর্যালোক, জল ইত্যাদি। আপাত বিচারে ভূমির মালিক পূর্বে অন্য কেউ ছিল এবং পরে অন্য কেউ হবে। এছাড়া অন্যান্য উপাদানগুলোও প্রকৃতিজাত, যার অধিপতি পরমেশ্বর ভগবান। ফসল উতপাদনের পর তা প্রথমে কৃষকের কাছে, তারপর মহাজন, শেষে সাধারণ ক্রেতা- এভাবে কেবল হস্তান্তরিত হয়। তাই সম্পত্তি যেখানেই থাকুক, কেউই তার মূল মালিক নন। প্রকৃত মালিক পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তাই বৃন্দাবনের যত গাভী, দুগ্ধ, ননী-মাখন রয়েছে, তারও মালিক কৃষ্ণই। মালিক যদি তার ঘর থেকে কাউকে অবগত না করেও কোনো কিছু গ্রহণ করেন, তবে তাকে চোর বলা যায় না। তাই মাখন চুরি কৃষ্ণের অভিনয় বা লীলামাত্র। তা না হলে লক্ষ লক্ষ কামধেনু (সুরভী গাভী) যিনি পালন করেন, শতসহস্র লক্ষ্মীদেবী যাঁর পাদপদ্ম সেবা করার জন্য লালায়িত থাকেন, সেই পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণের অন্যের ঘরে ননী-মাখন চুরি করার কী অবশ্যকতা রয়েছে? তাহলে শ্রীকৃষ্ণ কেন এমন লীলা করেছেন তা জানা প্রয়োজন।
No Comment! Be the first one.