বাতসল্য রস আস্বাদন ও ভগবত্তার পূর্ণ প্রদর্শনঃ অত্যন্ত বিত্তশালীও যদি পিতামাতাকে হারায়, তাদের বাতসল্য প্রেম আস্বাদন করতে না পারে, তবে তাকে অনাথ বলা হয়। অর্থাত, কেউ পিতৃমাতৃহীন হলে তা তার জীবনের অপূর্ণতা। কিন্তু ভগবান পরমপূর্ণ। তাই পূর্ণতাহেতু তাঁর মধ্যে বাতসল্য প্রেম আস্বাদনের প্রবণতা অবশ্যই রয়েছে। সেজন্য তিনি বাতসল্য পেম আস্বাদন করেন। আবার বিষ্ণু, নৃসিংহ প্রমুখ যেসকল অবতারে কৃষ্ণ ঐশ্বর্যভাব প্রদর্শন ও ভগবানরূপে মর্যাদা লাভ করেন, তিনি পূর্ণ বাতসল্য থাকে না। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং রূপে অর্থাত গোপবালকরূপে অবতীর্ণ হয়ে সেই বাতসল্য প্রেম পূর্ণরূপে আস্বাদন করেন। ব্রজবাসীরা কৃষ্ণকে ভগবানরূপে নয়, বরং তাদের সন্তানস্নেহে প্রতিপালন করে পরম তৃপ্তি লাভ করেন। তাই সাধারণ শিশুর মতো পিতামাতা গ্রহণ করে তাদের ভতর্সনা, স্নেহ-ভালোবাসা আস্বাদনের লীলা জগজ্জীবের প্রতি কৃষ্ণের পূর্ণ ভগবত্তারই প্রদর্শন।
জীবকে আকৃষ্টকরণ ও মুুক্তিদানঃ শিশু খুব চঞ্চল হলে প্রতিবেশীরা সর্বদাই তার কথা চিন্তা করে। তার কথা পরস্পর আলোচনা করে আনন্দ পায়। এভাবে ব্রজগোপীরাও সবসময় ভাবতেন- এই বুঝি কৃষ্ণ এলো। তারা প্রার্থনা করতেন যেন কৃষ্ণ তাদের গৃহে এসে মাখন চুরি করেন, তাদের দর্শন দান করেন, তারা যেন কৃষ্ণকে কাছে পেতে পারেন। কৃষ্ণ তাদের সেই প্রার্থনা পূরণ করতে তাদের গৃহে ননীচুরি করতে যেতেন। এভাবে, মাখনচুরি লীলার মাধ্যমে কৃষ্ণ ব্রজবাসীদের তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং তাঁর দিব্য ভাবনায় নিমগ্ন রাখেন। সমস্ত জীব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অংশ। তাই যেহেতু দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মধুর প্রভৃতি রসের আদান-প্রদান প্রত্যেক জীবের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, সুতরাং জীবের অংশীরূপে এসকল ভাব কৃষ্ণের মধ্যেও রয়েছে। এসকল রসের আদান-প্রদান জীবে-জীবে হলে তা সাংসারিক ভাব এবং তা জীবের বন্ধনের কারণ হয়। তাই এ একই আদান-প্রদান ভগবানের সঙ্গে হলে জীব বন্ধনমুক্ত হয়। ভগবদ্গীতায় (৪.৯) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন- হে অর্জুন, যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন তাকে আর দেহ ত্যাগের পর পুনরায় জন্ম গ্রহণ করতে হয়না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।
আবার, এজগতের কাউকে ভালোবেসে কেউ কখনো পূর্ণরূপে তৃপ্ত হতে পারে না- তারা আরো সুদর্শন, আরো ঐশ্বর্যবান, আরো শক্তিশালী, জ্ঞানী, যশস্বী কোনো পিতামাতা, পতি, সন্তান বা বন্ধু চায়। কৃষ্ণের মধ্যে এসকল গুণ পূর্ণরূপে বিদ্যমান। তাই কৃষ্ণ এজগতে আবির্ভূত হয়ে এমন চিত্তাকর্ষক লীলা প্রদর্শন করেন, কেন জীবনিচয় তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন রসে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে এবং চরমে জড়জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে।
ভক্তের আনন্দবিধান: ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আত্মারাম। তাই আনন্দ লাভের জন্য তাঁর কোনো বাহ্য বিষয়ের আবশ্যকতা নেই। তবে, তিনি যেহেতু সমস্ত আনন্দরসের আধার ও ইচ্ছাময়, তাই তিনি তাঁর ইচ্ছানুসারে সেই আনন্দ অন্তরে তো আস্বাদন করেনই, অধিকন্তু জীবের প্রতি করুণাপরবশ হয়ে তিনি তাদেরও সেই আনন্দ দান করতে চান। তাই এজগতে অবতীর্ণ হয়ে সাধারণ মানুষ্যের ন্যায় তাঁর লীলা-বিলাসের মুখ্য উদ্দেশ্য তাঁর প্রিয় ভক্তদের দিব্য আনন্দ দান করা। এ কারণে তিনি সাধারণ শিশুর মতো দামবন্ধনাদি বিচিত্র লীলা করেন।
ভগবানের অপ্রাকৃত চৌর্যলীল থেকে শিক্ষাঃ
আমরা হয়ত কৃষ্ণকে মাখন চোর আখ্যা দিতে পারি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারাই চোর, যারা শ্রীকৃষ্ণের সম্পত্তি তাঁকে না জানিয়ে নিজেই ভোগ করছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তা বলেছেন- তাঁরই প্রদত্ত দ্রব্য তাঁকে নিবেদন না করে যারা ভোগ করে, তারা নিশ্চয়ই চোর (ভ.গী. ৩.১২)। শ্রীকৃষ্ণ চৌর্যলীলার দ্বারা বোঝাতে চান, আমরা যেসব সম্পত্তি নিজের বলে মনে করছি, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে তাঁরই। তাই যদি সমস্ত সম্পদ তাঁর সেবায় নিযুক্ত করা হয়, তাহলে তিনি আমাদের জড়বন্ধন থেকে মুক্ত করবেন। বলি মহারজ ভগবান বামনদেবকে ত্রিপাদ ভূমি প্রদানের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। আর ভগবান ছলপূর্বক তার কাছ থেকে সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্ত বলি মহারাজ ব্যথিত না হয়ে দানের শর্তপূরণের জন্য ভগবানের চরণে আত্মসমর্পন করেছিলেন। আর ভগবান এই জড় সম্পত্তি হরণ বলি মহারাজের প্রাসাদের দ্বাররক্ষী হয়ে তাঁর ভক্তবতসলতা প্রদর্শন করেছিলেন।
মাখন চুরির ছলে কৃষ্ণ ব্রজগোপীদের মাখন সদৃশ কোমল-নির্মল হৃদয় চুরি করেছেন। তিনি জীব-হৃদয়ের সমস্ত পাপ হরণ করেন। তাই শ্রীকৃষ্ণের এ মাখনচুরি লীলা আদৌ নিন্দনীয় নয়। শ্রীকৃষ্ণ যদি চৌর্যলীলা তথা আমাদের চিত্ত হরণ না করেন, তাহলে আমরা জন্মজন্মান্তর ধরে নিজ ইন্দ্রিয়তৃপ্তির বাসনার ফলে বিভিন্ন যোনিতে ভ্রমণ করবো। তাছাড়া, এ জগতে কেউ চুরি করলে তাকে দণ্ড দেওয়া হয় এবং সে নিন্দিত হয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এমন লীলার জন্য নিন্দিত বা দণ্ডিত নন, বরং তিনি নন্দিত ও বন্দিত। শ্রীবল্লভাচার্য বলেছেন- ব্রজে প্রসিদ্ধং নবনীত চৌরং— চৌরাগ্র্যগণ্যং পুরুষং নমামী। এ জগতে কেউ কখনো চোরেরে উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেন না। তাহলে কৃষ্ণ কেমন চোর ! প্রকৃতপক্ষে এই চৌর্যলালা জগজ্জীবের প্রতি কৃষ্ণের অপার করুণারই নিদর্শন।
No Comment! Be the first one.