শ্রীগৌতমীয়তন্ত্রে (৭ম অধ্যায়) গুরুতত্ত্ব বলা হয়েছে-
ওঁ অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।
যিনি অজ্ঞানরূপ অন্ধকারে আচ্ছন্ন জীবের অন্ধকার নাশ করে আলোকরূপ জ্ঞান প্রদান করেন, তিনিই গুরু। গুরুদেব ভগবানের কৃপাশক্তির মূর্ত বিগ্রহ। জীবের প্রতি বিশেষ করুণার ফলে ভগবান গুরুরূপে অবতীর্ণ হন। গুরুদেব শিষ্যকে সম্বন্ধ জ্ঞান দান করেন।
শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/৩/২১) বলা হয়েছে-
তস্মাদ্ গুরুং প্রপদ্যেত জিজ্ঞাসুঃ শ্রেয়ঃ উত্তমম্।
শাব্দে পরে চ নিষ্ণাতং ব্রহ্মণ্যুপশমাশ্রয়ম্।।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (৭/২৬) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-
বেদাহং সমতীতানি বর্তমানানি চার্জুন।
ভবিষ্যাণি চ ভূতানি মাং তু বেদ ন কশ্চন।।
অর্থাৎ “হে অর্জুন, আমি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে অবগত। আমি সমস্ত জীব সম্বন্ধে জানি, কিন্তু আমাকে কেউ সম্পূর্ণরূপে জানে না।”
কেবল ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সর্বজ্ঞ, তিনি ত্রিকালের সমস্ত কিছুই অবগত, কিন্তু কেউই তাঁকে পূর্ণরূপে অন্য কেউই জানেন না। শুধু তাই নয়, তাঁকে লাভ করার জন্য সাধ্য ও সাধন বিষয়েও তিনি ছাড়া পূর্ণরূপে অন্য কেউই জানেন না। সুতরাং, সমস্ত জীবের অজ্ঞানান্ধকার নাশ করার জন্য ভগবত্তত্ত্বজ্ঞান বা শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তি প্রদানের জন্য শ্রীকৃষ্ণই গুরুরূপে তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তগণকে আশ্রয় করে আবির্ভূত হন।
কখনো স্বয়ং ভগবান, কখনো তাঁর নিত্যসিদ্ধ পার্ষদগণ আবার কখনো কোনো জীবের মধ্যে তাঁর শক্তির আবেশ ঘটিয়ে তিনি গুরুরূপে বদ্ধজীবদের শিক্ষা প্রদান করেন। আবার তিনি চৈত্যগুরুরূপে প্রত্যেক জীবের মধ্যে তাঁর শক্তির আবেশ ঘটিয়ে তিনি গুরুরূপে বদ্ধজীবদের শিক্ষা প্রদান করেন। আবার তিনি চৈত্যগুরুরূপে প্রত্যেক জীবের হৃদয়ে থেকে জীবকে পরম তত্ত্ব প্রাপ্তির উপায় নির্দেশ করেন।
শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/২৯/৬) বলা হয়েছে-
নৈবোপযন্ত্যপচিতিং কবয়স্তবেশ
ব্রহ্মায়ুষাপি কৃতমৃদ্ধমুদঃ স্মরন্তঃ।
যোহন্তর্বহিস্তনুভৃতামশুভং বিধুন্ব-
ন্নাচার্যচৈত্ত্যবপুষা স্বগতিং ব্যনক্তি।।
অর্থাৎ “হে ঈশ্বর, তুমি বাইরে আচার্যরূপে এবং অন্তরে অন্তর্যামীরূপে দেহধারী জীবের অশুভ অর্থাৎ ভক্তিপ্রতিকূল বিষয়-বাসনা নাশ করে তার গতি প্রদান করো। অতএব তোমাতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ভক্তিরূপ পরমানন্দে নিমগ্ন হয়ে ব্রহ্মজ্ঞানসম্পন্ন কবিগণ কল্পান্তকাল তোমার সেবায় নিযুক্ত থেকেও তোমার উপকারের কথা স্মরণ করে কিছুতেই ঋণমুক্ত হতে পারেন না।
শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে (মধ্য, ২২/৪৭) বলা হয়েছে-
কৃষ্ণ যদি কৃপা করে কোনো ভাগ্যবান।
গুরু-অন্তর্যামীরূপে শিখায় আপনে।।
“চৈত্যগুরুরূপে শ্রীকৃষ্ণ সকলেরই হৃদয়ে বিরাজমান। তিনি যখন কোন ভাগ্যবান ব্যক্তিকে কৃপা করেন, যেন তিনি স্বয়ং তাকে বাইরে গুরুরূপে এবং অন্তরে অন্তর্যমীরূপে ভগবদ্ভক্তির শিক্ষা দেন।”
জীবে সাক্ষাৎ নাহি, তাতে গুরু চৈত্যরূপে।
শিক্ষাগুরু হন কৃষ্ণ মহান্তস্বরূপে।।
——-চৈ.চ. আদি ১/৫৮
সুতরাং বোঝা গেল যে, অন্তর্যামী গুরুর সাথে বাহ্যত সাক্ষাৎ হয় না; তিনি অন্তরে থেকে কেবল প্রেরণার দ্বারাই জীবকে শিক্ষা দেন। কিন্তু সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ‘মহান্তস্বরূপে’ অর্থাৎ সাধু-সজ্জন বা ভক্তগণের দ্বারা শিক্ষা দিয়ে থাকেন- প্রকারান্তরে তিনি কৃষ্ণই।
No Comment! Be the first one.