# মানুষ যেমন তার দেহ থেকে তার প্রাণবায়ুকে আলাদা করতে পারে না, শিষ্যও তেমনি তার জীবন থেকে গুরুদেবের আদেশ বাদ দিয়ে চলতে পারে না। শিষ্য যদি সেই মনোভাব নিয়ে তাঁর গুরুদেবের উপদেশ মেনে চলে, তবে সে সুনিশ্চিতভাবে সফলতা অর্জন করবে। উপনিষদ আদিতে একথা প্রতিপন্ন হয়েছে যে পরম পুরুষোত্তম ভগবান এবং নিজ গুরুদেবের প্রতি যার অবিচল বিশ্বাস আছে, একমাত্র তাঁর কাছে বৈদিক উপদেশ সম্ভার আপনা হতেই প্রকটিত হতে থাকে।
# এই পৃথিবীকে বলা হয় দুঃখালয়ম। এটি প্রকৃতপক্ষে ভোগান্তির স্থান কিন্তু প্রত্যেকেই আমরা সুখী হতে চাই। মূলত আমরা সুখী নই।
# গুরুদেবই সিদ্ধান্ত নিবেন কোনটি আমাদের জন্য প্রযোজ্য, আর কোনটি নয়। কারণ তিনি সে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শিষ্যরাও গুরুদেবের আদেশ পালনে সচেষ্ট থাকবে। কাজেই আমরা যদি সদগুরুর সব আদেশ-নির্দেশ মেনে চলি, তাহলে তিনি আমাদের ভগবদ্ধামে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।
# ধন-সম্পত্তি, নারী এবং যশ-প্রতিষ্ঠা এ তিনটি বাসনা সমগ্র ভগবদ্ভক্তিকে গ্রাস করে নিতে পারে ঠিক যেমন বাঘিনী তার শিকারের হৃতপিন্ড ছিড়ে বার করে নেয়, তেমনই এ বাসনাগুলিও ভগবদ্ভক্তির হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে।
# মনকে আমরা যেদিকেই যেতে দিব সেদিকেই সে চলে যাবে। মনকে সংযত করার মানে হচ্ছে তাকে শ্রীকৃষ্ণের অভিমুখে বারে বারে ফিরিয়ে আনা, তা হলেই আমরা নিরাপদ।
# পারমার্থিক জ্ঞানের সাহায্যে একজন তার নিজের সম্বন্ধে, বিশ্বব্রহ্মান্ড সম্বন্ধে এবং ভগবান সম্বন্ধে জানতে পারেন। এটি কখনো হারিয়ে যায় না। এই জ্ঞান হৃদয়কে সম্পূর্ণরূপে আলোকিত করে, আত্মাকে সুখ ও শান্তি প্রদান করে।
# কৃষ্ণভাবনামৃতে আসার পর থেকে আমরা যা করি তার জন্য দায়ী থাকি। যদি আমরা সামান্য সাবধান হই, কৃষ্ণ অবশ্যই আমাদের রক্ষা করবেন। কিন্তু যদি আমরা সাবধান না হই, নির্বিশেষবাড়ী ও সহজিয়াদের পথ অনুসরণ করি, কৃষ্ণ ও বৈষ্ণব অপরাধ করি তাহলে তা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। আমাদের মতবাদ হচ্ছে যাতে গুরু এবং কৃষ্ণ সন্তুষ্ট হন, তা আমাদের চেষ্টা করা উচিত, তখন যদি তাঁরা (গুরু এবং কৃষ্ণ) সুখী হন, তাহলে আমরা শান্তি লাভ করব এবং আধ্যাত্মিক আনন্দ ও সুখ পাব।
# শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন দক্ষিণ ভারত যান, তিনি সব ধরণের মন্দিরই পরিদর্শন করেন শুধু বিষ্ণু মন্দিরই নয়, শিব মন্দির, দুর্গা মন্দির, মিনাক্ষী মন্দির, গণেশ মন্দিরও পরিদর্শন করেন, কিন্তু প্রত্যেক মন্দিরেই তিনি একই মন্ত্র জপ করেন- হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
# একজন ভক্ত ধীরে ধীরে দেখতে পাবেন যে, কেবল আমাদের মন্দিরেই নয়, প্রত্যেক মন্দিরেই অনেক আন্তরিক ভক্ত আছেন এবং তাঁরা সকলেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর খুব প্রিয়। আমরা যদি গুরু ও গৌরাঙ্গের সেবায় তাদের উতসাহিত করি, তবে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু ও নিত্যানন্দ প্রভু সন্তুষ্ট হবেন। আর তখন স্বাভাবিকভাবেই সহযোগীতার ভাব গড়ে উঠবে।
# জড় বাসনা থেকে মুক্ত হওয়ার একটি উপায় হলো ভক্তসঙ্গ। ভক্তসঙ্গে থাকলে কৃষ্ণভাবনার প্রতি আমাদের আসক্তি বৃদ্ধি পায়।
# অসত সঙ্গের ফলে ভক্তরা ভক্তিজীবনের পাশাপাশি বিষয় আসক্তিও বজায় রাখতে চায়। কিন্তু যুগপত জড় ও চিন্ময় আসক্তি লাভ করা অসম্ভব। আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি আসক্তিই আমাদের জড় আসক্তি থেকে নিস্পৃহ করে পারমার্থিক জীবনে সাফল্য বয়ে আনে।
# কৃষ্ণভাবনামৃত সবকিছুকেই চিন্ময় করতে পারে, যা কিছু কৃষ্ণভাবনায় ব্যবহার করা যায় এমন কোন কিছুকে জড় বলে মনে করে ত্যাগ করাই ফল্গু বৈরাগ্য, মিথ্যা অহংকারের বশে গুরুদেব কর্তৃক অননুমোদিত তপশ্চর্যা করাও ফল্গু বৈরাগ্য।
#সাধারণত চিতজগতে উন্নীত হতে বহু বহু জন্মের সাধনা প্রয়োজন, কিন্তু ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার মাধ্যমে যে কেউ তা স্বল্প সময়ের মধ্যে লাভ করতে পারে।
# গুরুদেবের আদেশ নির্দেশাদি হল গুরুদেবের বাণী। গুরুদেবের সেই সমস্ত বাণী অনুসারে সেবা করে চলা এবং সেই ভাবে জীবনকে গড়ে তোলার নাম বাণী সেবা। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে গুরুদেবের শরীরের সেবা যত্ন করে থাকে। তাকে বলা হয় বপু সেবা। সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা। তবে বাণীসেবার মাধ্যমে গুরুদেবের সে সেবা করা হয়, সেটাই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গুরুদেবের নির্দেশাদি মেনে চলাটাই অবশ্য কর্তব্য।
# আমরা যদি শুদ্ধভক্তের মুখ থেকে লীলা বারবার শ্রবণ করতে থাকি, তবে ক্রমেই অধিক আকৃষ্ট হব, তা ছাড়া অসম্ভব। যদি কেউ আগুনের কাছে থাকে তবে সে উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হতে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের শুধু সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনভাবে আগুন ত্যাগ না করি, করলে তা হবে খুবই অনাকাঙ্খিত।
# আমরা যদি পরমেশ্বর ভগবানের কৃপা পেতে চাই তবে আমাদেরকে অকৃত্রিমভাবে ভাবতে হবে যে, আমরা যোগ্য নই, তবে কৃষ্ণের কৃপা আকর্ষণ করতে পারব। অন্যদিকে অযোগ্যতা হচ্ছে যে আমরা কৃপা লাভের যোগ্য।
# হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র অশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করলেও কৃষ্ণ বুঝতে পারেন যে, তুমি কৃষ্ণনাম জপ করার চেষ্টা করছ এবং তখন কৃষ্ণ তোমাকে আর্শীবাদ করেন।
#শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নির্দেশ দিয়েছেন যে, শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধ প্রেম অর্জন করতে হলে ভক্তকে অবশ্যিই বৈষ্ণব আচরণের বিজ্ঞানতত্ত্বে পারদর্শী হতে হবে। সুতরাং বৈষ্ণব আচরণের মান অনুযায়ী ভক্তিভাবময় সমাজে বসবাস ও মেলামেশা করে বৈষ্ণ আচার অথবা বৈষ্ণব ব্যবহার আয়ত্ত করার অর্থ নিজেকে একান্তভাবে পরিমার্জিত করে তোলা এবং প্রত্যেক আগ্রহী ভক্তকে এগুলি অবশ্যই শিখতে হবে এবং অনুশীলন করতে হবে।
# পারমার্থিক জ্ঞান ক্রমপন্থায় অর্জন করতে হয়। আমরা বলি না যে প্রত্যেকে তাদের জীবনধারা দ্রুত (অর্থ্যাত হঠাত) পরিবর্তন করুক। চৈতন্য মহাপ্রভু এভাব দ্রুত পরিবর্তন করতে নিষেধ করেছিলেন, কারণ এটি বিপদজনক। যদি কেউ হঠাত তার জীবনের সব কিছু পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে।
# ভক্ত প্রতিদিনই শ্রীমদ্ভাগবদগীতা ও শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ শ্রবণ করবে। তবেই তাঁর আত্মা পরিমার্জিত হবে এবং তবেই সে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে তাঁর সম্পর্ক উপলব্ধি করতে পারবে, আর সেই সম্পর্ক অনুসারে সেবাকার্য সম্পন্ন করলে জীবন সার্থক হয়ে উঠবে।
# বর্তমান বিশ্বে মানুষ মহাপ্রভু এবং বিশ্বব্যাপী হরিনামের প্রবর্তক শ্রীল প্রভুপাদ সম্পর্কে জানে না। তাই আমাদের উচিত মহাপ্রভুর দাস এবং প্রভুপাদের সৈনিক হিসেবে তাঁদের মহিমা গুণকীর্তন প্রচার করা।
No Comment! Be the first one.