শ্রীশ্রীরাধা-দামোদরের সন্তুষ্টির জন্য এ মাসে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঘৃত প্রদীপ নিবেদন করা কর্তব্য। সামর্থ্য থাকলে ঘৃত-প্রদীপ, নতুবা তিলের তেলের প্রদীপ নিবেদন করা কর্তব্য। কার্তিক মাসে ভগবানকে দীপদান এতই গুরুত্বপূর্ণ যে শাস্ত্রে বলা হয়েছে- “হে বিপ্রেন্দ্র, দরিদ্র নির্ধন ব্যক্তিরও আত্মবিক্রয় করে কার্তিক পূর্ণিমা যাবৎ দীপদান কর্তব্য। ত্রিভুবনে এমন কোন পাতক নেই, যা কার্তিকে শ্রীকেশবদেবের অগ্র্রে দীপদান শোধন করতে পারে না।” পদ্মপুরাণে বর্ণিত হয়েছে, দীপাবলির দিন শ্রীশ্রীসীতা-রামচন্দ্র এবং শ্রীশ্রীলক্ষ্মী-নারায়ণের প্রীতির উদ্দেশ্যে দীপদান কর্তব্য। দীপদানের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে হরিভক্তিবিলাসে বলা হয়েছে- “হে দেবর্ষি যারা সহস্র্র সহস্র পাপেও পাতকী, তারাও যদি কার্তিক মাসে শ্র্রীহরির উদ্দেশ্যে প্রদীপ নিবেদন করেন, তবে তারাও সমস্ত পাপ হতে মুক্ত হবেন।” যারা নিজে দীপদান করতে পারেন না, তারা যদি অন্যের প্রদত্ত প্রদীপকে প্রবোধিত করেন, অর্থাৎ নিভু নিভু প্রদীপের সলতে বাড়িয়ে দিয়ে আরো উজ্জ্বল করে তোলেন তারাও শ্রীহরির প্রিয় হন।
কার্তিক মাসে অন্যের প্রজ্বলিত প্রদীপ প্রবোধিত করলে যে ফল হয়, ইষ্টাদি মহাযজ্ঞ সাধনেও সে ফল লাভ সম্ভব হয় না। আন্যের প্রদত্ত দীপ প্রবোধন এবং বৈষ্ণবগণের সেবার দ্বারা রাজসূয় এবং অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়। একবার একটি ইঁদুর কার্তিকমাসে একাদশীতে মন্দিরে প্রজ্বলিত প্রদীপের ঘি খাওয়ার সময় অজান্তেই দীপের ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে দেয়; আর এর ফলে সে ভগবদ্ধাম প্রাপ্ত হয়।
দামোদর ব্রতের সংকল্প
মন্ত্রঃ
কার্তিকেহহয়ং করিষ্যামি প্রাতস্নানং জনার্দন।
প্রীত্যর্থং তব দেবেশ দামোদর ময়া সহ।।
অনুবাদঃ হে জনার্দন, হে দেবেশ, হে দামোদর, শ্রীরাধিকাসহ আপনার প্রীতির জন্য কার্তিকে আমি প্রাতঃস্নান করব। হরিভক্তিবিলাস (১৬/১৭২)
প্রার্থনা মন্ত্রঃ
তব ধ্যানেন দেবেশ জলেহস্মিন স্নাতুমুদ্যতঃ।
তৎপ্রসাদাচ্চ মে পাপং দামোদর বিনশ্যতু।।
অনুবাদঃহে দেবেশ, তোমার ধ্য্যান করে আমি এই জলে স্নান করতে উদ্যত, হে দামোদর, তোমার প্রসাদে আমার পাপ বিনাশ হোক। হরিভক্তিবিলাস (১৬/১৭৩)
অর্ঘ মন্ত্রঃ
ব্রতিনঃ কার্তিকে মাসি ম্নাতস্য বিধিবন্মম।
দামোদর গ্রহাণার্ঘ্যং দনুজেন্দ্রনিসূদন।।
নিত্যে নৈমিত্তিকে কৃৎস্নে কার্তিকে পাপশোষণে।
গৃহাণার্ঘ্যং ময়া দত্তং রাধয়া সহিতো হরে।।
অনুবাদঃ নিত্যনৈমিত্তিক সমগ্র পাপশোষণকারী কার্তিকমাসে ব্রতী আমি বিধিবৎ স্নানকারী, হে দামোদর, হে দনুজেন্দ্রনিসূদন, হে হরে, আমার প্রদত্ত অর্ঘ রাধিকাসহ গ্রহণ কর। হরিভক্তিবিলাস (১৬/১৭৪-৭৫)
আকাশদীপঃ
এ সময় ভগবানের শ্রীমন্দিরের শিখরে প্রদীপ প্রদান এবং মন্দির প্রদীপ দিয়ে সজ্জিত করার অনন্ত মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে- “শ্রীহরির মন্দিরের শিখরে যখন যখন দীপ দেওয়া হয়, তখন তখন পাপরাশি দ্রবীভূত হয়। শুদ্ধ ব্রাহ্মণকে সমগ্র পৃথিবী দান করলে যত পূর্ণ হয় তা মন্দিরের উপরে প্রদীপ দানের ষোল ভাগের এক ভাগও নয়।” “যিনি বিষ্ণুমন্দিরের ভিতরে এবং বাইরে দীপমালা রচনা করেন, তিনি শ্রীবিষ্ণুর পার্ষদ। তাঁর ভগবদ্ধাম গমনকালে পথে দেবগণ দীপ হাতে করে অপেক্ষা করতে থাকেন।”
পদ্মপুরাণে বর্ণিত হয়েছে, কেউ যদি ভগবান শ্রীদামোদরের উদ্দেশ্যে আকাশদীপ এবং জলে প্রদীপ প্রদান করেন, তিনি ধন-ধান্যবান, সমৃদ্ধিশালী, সুপুত্র ও ঐশ্বর্যবান হন। এছাড়াও পথে, বৈষ্ণবগৃহে, তরুমূলে, গোশালায়, দুর্গম বনপথে শ্রীহরির প্রীতির উদ্দেশ্যে প্রদীপ প্রদান করলে মহাফল লাভ হয়। সমগ্র কার্তিক মাস তথা দামোদর মাসে মাষকলাই ডাল এবং আমিষাহার বর্জন করে ভগবান শ্রীদামোদরের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে প্রদীপ প্রদান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে মানুষসহ সকল জীবই ভগবানের অপ্রাকৃত করুণা প্রাপ্ত হতে পারে। সমগ্র কার্তিকে দীপদানের মহিমা কীর্তিত হয়েছে। তবে একাদশী এবং দীপাবলিতে প্রদীপদান আরো বিশেষভাবে মহিমান্বিত হয়েছে।
No Comment! Be the first one.