ভগবানের সকল সেবারই মূল উদ্দেশ্য তাঁর প্রসন্নতা বিধান। ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রদীপ নিবেদনের মাধ্যমে তাঁর আরতি করারও এটাই উদ্দেশ্য। আরতি দ্বারা আমরা ভগবানের কাছে আমাদের হৃদয়ের আর্তি জানাতে পারি। সাধারণত আরতি বলতে বোঝায় সৃষ্টির বিভিন্ন উপাদানসমূহ বিগ্রহরূপী ভগবানকে নিবেদন করা। ভগবদ্গীতায় (৭.৪-৫) বর্ণনা করা হয়েছে, এই জড় জগৎ ভূমি, জল, বায়ু, আগুন, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহংকার- এই আটটি উপাদান দিয়ে গঠিত। এখানে ভূমি দ্বারা সমস্ত কঠিন, জল দ্বারা তরল, বায়ু দ্বারা বায়বীয়, আকাশ দ্বারা শূণ্যমাধ্যমে ও শব্দতরঙ্গ, অগ্নি দ্বারা বিভিন্ন প্রকার বিকিরণ ও শক্তিকে বোঝায়। আরতির সময় আমরা এই আটটি উপাদানের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন দ্রব্যাদি ভগবানকে নিবেদন করি। ফুল এবং বস্ত্র দ্বারা ভূমিকে, জল দ্বারা জলীয় বস্তুকে, প্রদীপ দ্বারা অগ্নিকে, চামর দ্বারা বায়ুকে, শঙ্খ ও ঘন্টাধ্বনি দ্বারা আকাশকে, বিভিন্ন মন্ত্র ও কীর্তনের দ্বারা মনকে, আরতিতে পূর্ণরূপে সমর্পণের দ্বারা বুদ্ধিকে, প্রণাম দ্বারা অহংকারকে পূজারী শ্রীবিগ্রহের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে থাকে। আরতির দ্রব্যসমূহ চক্রাকারে ঘুড়ানো হয়, কারণ তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কালের আবর্তে সর্বদা আমাদের সকল কার্যক্রম ভগবানকে কেন্দ্র করে সম্পাদন করা উচিত।
তাছাড়া, আমাদের যা কিছু আছে সবই ভগবানের। আরতি হচ্ছে বৈদিক শাস্ত্রে বর্ণিত পঞ্চরাত্রের এমন একটি পন্থা যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সবকিছুই ভগবানের সম্পত্তি। যখন বিভিন্ন দ্রব্য ভগবানকে নিবেদন করা হয়, তখন ভগবান তা গ্রহণ করে প্রসাদ (কৃপা) রূপে আমাদের তা প্রদান করেন। তখন আমরা তাঁকে নিবেদিত দীপশিখায় আমাদের হাত স্পর্শ করে, প্রসাদী পুষ্প আঘ্রাণ করে ও শঙ্খ জল শিরে ধারণ করে ভগবানের প্রসাদ বা কৃপা লাভ করি এবং এর দ্বারা ভগবানের প্রতি আমাদের সমর্পণ বৃদ্ধি পায়। একটি দীপশলাকার সামান্য অগ্নি যেমন একটি গ্রামকে ভষ্মীভূত করে দিতে পারে, তেমনি ভগবানা দামোদরের প্রীতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি প্রদীপ আমাদের রাশি রাশি পাপ ভস্মীভূত করার জন্য যথেষ্ট।
দীপ নিবেদনের পদ্ধতিঃ
সাধারণত ঘি বা তিল তেলের দীপ এ মাসে অনুমোদিত। শুদ্ধবস্ত্র পরিধান করার পর আচমন করে প্রথমে দীপ শ্রীগুরুদেবের করকমলে অর্পণ করতে হয়। এরপর মানসে তার পক্ষ হয়ে আপনি তা শ্রীভগবান ও ভগবৎপার্ষদবৃৃন্দকে দীপ নিবেদন করতে পারেন। শ্রীভগবানের শ্রীপাদপদ্মে ঘড়ির কাঁটার দিকে চক্রাকারে চারবার, নাভিদেশে দুবার, মুখমণ্ডলে তিনবার আর সর্বাঙ্গে সাতবার ঘুরিয়ে দীপ নিবেদন করতে হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে শ্রীশ্রীরাধা-দামোদর, শ্রীশ্রীজগন্নাথ-বলদেব-সুভদ্রা, শ্রীশ্রীনৃসিংহদেব, শ্রীশ্রীপঞ্চতত্ত্ব, শ্রীবৃন্দাদেবী, ষড়গোস্বামী, গুরুপরম্পরা, শ্রীল প্রভুপাদ ও শ্রীগুরুদেব ও পরে ভক্তবৃন্দকে নিবেদন করতে হয়।
তুলসীকাষ্ঠের দীপদানঃ
তুলসী শ্রীহরিবল্লবা। এই মাসে প্রতিদিন তুলসী দ্বারা দামোদরের অর্চন কর্তব্য। সিই সাথে শুষ্ক তুলসী কাষ্ঠের দীপ ভগবানকে নিবেদন করা যায়। হরিভক্তিবিলাস ধৃত প্রহ্লাদ সংহিতায় উল্লেখ আছে-
তুলসী-পাবকেনৈব দীপং যঃ কুরুতে হরেঃ।
দীপলক্ষসহস্রাণাং পুণ্যং ভবতি দৈত্যজ।।
অনুবাদঃ হে দৈত্য কুমার, যিনি তুলসীকাষ্ঠের অগ্নিদ্বারা শ্রীহরিকে দীপদান করেন, তিনি সহস্র লক্ষ দীপদানের ফলভাগী হন। হরিভক্তিবিলাস (৮/৫৪)
No Comment! Be the first one.